জাতির জনকের স্বীকৃতি পাচ্ছেন বঙ্গবন্ধু

‘যতদিন রবে পদ্মা মেঘনা গঙ্গা যমুনা বহমান/ ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান’- অন্নদাশংকর রায়ের এই অনন্যসাধারণ পঙ্‌ক্তিমালায় স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা ও রূপকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসামান্য অবদানের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধার অর্ঘ্য নিবেদিত হয়েছে। যার সীমাহীন ত্যাগ, আপসহীন নেতৃত্ব ও অসামান্য আকাশছোঁয়া প্রভাবে বাঙালি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে অগ্নিঝরা পথে বাংলাদেশে স্বাধীনতার লাল-সবুজ পতাকা উত্তোলন করতে সমর্থ হয়েছে, তার প্রাপ্য মর্যাদা প্রদানে স্বার্থান্ধ রাজনীতি অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে যুগের পর যুগ।

বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার সেই বাধার প্রাচীর ভেঙে কোটি কোটি মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করে বঙ্গবন্ধুকে ‘জাতির জনক’-এর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করতে যাচ্ছে। স্বাধীনতার ৩৬ বছর পর অবশেষে দূর হচ্ছে অসহনীয় গ্লানি। একই সঙ্গে বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ জিয়াউর রহমানও পাচ্ছেন তার প্রাপ্য স্বীকৃতি। খণ্ডিত রাজনৈতিক স্বার্থে স্বাধীনতা যুদ্ধে তার অবদানও অস্বীকার করা হয়েছে এতদিন। শহীদ জিয়াও পাচ্ছেন স্বাধীনতার ঘোষণার স্বীকৃতি। বঙ্গবন্ধুর পক্ষে জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন বলে স্বীকৃতিতে উল্লেখ থাকবে। আওয়ামী লীগ নিছক দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বঙ্গবন্ধুকে শুধু তাদের সম্পদ হিসেবে আগলে রাখার চেষ্টা করেছে। রক্তমাংসের মানুষটিকে করে ফেলেছিল ‘মহামানব’। বিএনপি বঙ্গবন্ধুর অবদানকে ‘তুচ্ছ’ করে ইতিহাস বিকৃতির নোংরা পথে চলেছে। আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধে শহীদ জিয়ার অবদান ও ’৭৫-পরবর্তী সংকটকালে তার ভূমিকাকে স্বীকার করেনি। নিছক রাজনৈতিক স্বার্থে জাতিকে দু’শিবিরে ভাগ করে রাখার দুর্ভাগ্যজনক দিনগুলোর অবসানের লক্ষ্যেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার স্বীকৃতি প্রদানের এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে।

মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, মুক্তিযুদ্ধকালে অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী সৈয়দ তাজউদ্দিন আহমদ, মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল (অব.) এমএজি ওসমানীসহ আরও কয়েকজন পাচ্ছেন জাতীয় নেতা ও জাতীয় বীরের স্বীকৃতি। সরকার এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করছে বলে জানা গেছে।

বর্তমান নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার গত ১১ জানুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর নানা ক্ষেত্রে বিভিন্নমুখী সংস্কার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। দেশে গণতন্ত্রের ভিতকে শক্তিশালী করতে রাজনৈতিক সংস্কার, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে নির্বাচন পদ্ধতি সংস্কারের জন্য ইতিমধ্যেই কাজ শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট ও হানাহানির অন্যতম প্রধান কারণ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে নিহত হওয়ার পরবর্তী প্রায় ৩২ বছর জাতির জনক আর স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে বিতর্ক বাঙালি জাতিকে দ্বিধাবিভক্ত করে ফেলে। বাঙালি জাতির স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে অনেকে মনগড়া ব্যাখ্যা দিতে থাকেন। যে ক্ষেত্রে যার যার অবদান আছে তা থেকে তাকে বঞ্চিত করা বা খাটো করার অপপ্রয়াস চলে। এতে রাজনীতি যেমন সংঘাতময় হয়ে ওঠে, তেমনি নতুন প্রজন্ম প্রকৃত ইতিহাস জানা থেকে বঞ্চিত হয়। এ কারণে জাতির জনক, ঘোষক, জাতীয় নেতা ও জাতীয় বীররা জাতির সম্পদের পরিবর্তে দলীয় সম্পদে পরিণত হন। কায়েম হয় পরিবারতন্ত্র। ফায়দা লুটে সুবিধাভোগী একশ্রেণীর রাজনীতিক। সূত্র জানায়, রাজনৈতিক সংস্কারকে সফল করতে এবং স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারীদের সম্পর্কে বিভ্রানি- দূর করতেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার জাতির জন্য যার যা অবদান আছে তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দিতে আইন প্রণয়নের বিষয়টি নিয়ে অনেক এগিয়েছে। এ ব্যাপারে বিভিন্ন দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গেও বিভিন্ন মাধ্যমে কথাবার্তা চলছে।

সূত্র মতে, প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ তার সরকারের এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিনে টুঙ্গিপাড়ায় তার মাজারে গিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থাকা বঙ্গবন্ধুর মাজার প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণেরও নির্দেশ দেন। সরকার নিয়ন্ত্রিত বিটিভিতে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের বিভিন্ন অনুষ্ঠান গুরুত্ব সহকারে প্রচার করা হয়। এর আগে ৭ মার্চ ১৯৭১ সালে তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর প্রদত্ত স্বাধীনতার দিকনির্দেশনা সংবলিত ভাষণ প্রচার করা হয়। ২৫ মার্চ বিটিভি আবারও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের কিছু অংশ প্রচার করে। একই সময় বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করা হয়। জিয়াউর রহমানের কণ্ঠ বিটিভির শ্রোতারা স্পষ্টভাবে শুনতে পায়। ড. ফখরুদ্দীন আহমদ আগামী ৩০ মে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে তার মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। এছাড়াও অন্য জাতীয় নেতা ও জাতীয় বীরদের প্রতিও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে। বঙ্গবন্ধুর মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু, জাতীয় নেতা ও জাতীয় বীরদের রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতির কাজটি শুরু হয়েছে।

দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের হূত গৌরব পুনরুদ্ধারের ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব গ্রহণ করে। প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ ও সেনাবাহিনী প্রধান লে. জেনারেল মঈন উ আহমেদ একাধিক অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন। সেনাপ্রধান সোমবার মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে এক মতবিনিময়কালে আক্ষেপ করে বলেছেন, গত ৩৬ বছরে দেশ জাতির পিতাকে স্বীকৃতি দিতে পারেনি। সোমবার স্বাধীনতা দিবসে জাতীয় দিবসের কুচকাওয়াজ উপলক্ষে প্রকাশিত স্যুভেনিরে এবং অনুষ্ঠানের ধারা বর্ণনায় বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক ও বঙ্গবন্ধুর পক্ষে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার কথা গুরুত্বসহকারে উল্লেখ করা হয়। স্যুভেনিরে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের তেজদীপ্ত অংশগুলো উদ্ধৃত করা হয়। প্রচ্ছদে জাতীয় নেতাদের মাঝখানে মধ্যমণি হিসেবে ছাপা হয় বঙ্গবন্ধুর ছবি। জাতির জনক হিসেবে বঙ্গবন্ধু ও অন্যান্য নেতার অবদান যথার্থভাবে স্বীকৃতি দানের এই উদ্যোগকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল স্বাগত জানিয়েছে। তারা বলেছেন, এর ফলে জাতি ইতিহাস বিকৃতির ভয়াবহ অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে। Source:দৈনিক যুগান্তর
Date:2007-03-28

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: