বিদেশে পাচার করা হাজার হাজার কোটি টাকা ফিরিয়ে আনা হবে

সেনাবাহিনী প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মইন উ আহমেদ দেশের দুর্নীতিবাজ রাজনীতিক ও কালো টাকার মালিকদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, দুর্নীতিবাজ রাজনীতিকরা হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন। তারা দেশের অর্থনীতিকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে ফেলেছেন। তিনি রাজনীতিবিদদের পাচার করা অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা হবে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। মঙ্গলবার জাতীয় প্যারেড স্কোয়ারে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ আয়োজিত প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধাদের এক সমাবেশে তিনি একথা বলেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর গত ৩৬ বছরে দেশ কিছুই পায়নি। পেয়েছে কেবল কিছু দুর্নীতিবাজ রাজনীতিক। এরা দুর্নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রের সম্পদ লুটপাট করেছে। সম্পদের পাহাড় গড়েছে। পরে স্বাধীনতা দিবসের কুচকাওয়াজে অংশ নেয়া মুক্তিযোদ্ধা কন্টিনজেন্টদের সম্মানে জাতীয় প্যারেড স্কোয়ারে চা-চক্রের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধাদের স্মারক ও সনদ প্রদান করা হয়।

জেনারেল মইন উ আহমেদ আক্ষেপ করে বলেন, স্বাধীনতার ৩৬ বছর পরও আমরা আমাদের জাতির পিতাকে স্বীকৃতি দিতে পারিনি। অন্য শীর্ষ নেতাদেরও স্বীকৃতি দিতে পারিনি। এজন্য তিনি দেশের ‘বিভক্তির রাজনীতি’কে দায়ী করে বলেন, আমাদের রাজনীতিকরা দেশকে শুধু বিভক্তই করে গেছেন। ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেননি। করতে পারেনওনি। তিনি বলেন, কিন’ এখন সময় এসেছে। এখন সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ঐক্যবদ্ধভাবে একযোগে এগিয়ে যেতে হবে। তিনি বলেন, গত ৩৬ বছরে দেশ ভালো রাজনীতিক পায়নি। ওই রাজনীতিকরা ভালো কিছুই দিতে পারেননি। তারা দিয়েছেন কেবল দুর্নীতি আর লুটপাট।

সেনাবাহিনী প্রধান তার বক্তব্যে আমেরিকা থেকে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি একে মহিউদ্দিন আহম্মেদসহ অন্য পলাতকদের দেশে আনার ব্যবস্থা করার কথা উল্লেখ করে বলেন, সরকার তাদের ফেরত আনার ব্যাপারে সবরকম ব্যবস্থা নিচ্ছে। কর্নেল মহিউদ্দিনকে সহসাই আনা হচ্ছে। বাকিদের ব্যাপারেও ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, এতদিন যে প্রক্রিয়া বন্ধ ছিল সে প্রক্রিয়াটি এখন শুরু হচ্ছে। বর্তমান সরকার ওই মামলার বিষয়টি শেষ করবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান জেনারেল কেএম শফিউল্লাহ, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মীর শওকত আলী, মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের অনেকেই বক্তৃতা করেন।

সেনাবাহিনী প্রধান তার বক্তৃতায় স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন, সেনাবাহিনী সরকার পরিচালনা করছে না, সহযোগিতা করছে মাত্র। চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে নতুন খনি পাওয়া গেছে। তা হল ত্রাণের টিনের খনি। আরও অনেক কিছু পাওয়া যাচ্ছে। অনেকে অনেক জিনিস লুট করে দেশের বাইরে নিয়ে গেছে। তিনি বলেন, গত পাঁচ বছরে শুধু বিদ্যুৎ খাত থেকেই চুরি হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আরও অনেক তথ্য বের হয়ে আসছে, যা শুনলে আপনারা অনেকে শিউরে উঠবেন। তিনি বলেন, আপনারা হয়তো দেখেছেন অতি মূল্যবান বিলাসী গাড়ি এখন আর রাস-ায় দেখা যাচ্ছে না। এখানে-ওখানে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যাচ্ছে। দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চলাকালে রাজনীতিকদের কাছ থেকে আটক করা বিলাসবহুল গাড়িগুলো নিলামে বেচে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে গরিবদের জন্য একটি হাসপাতাল বানানোর জন্য তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

মুক্তিযোদ্ধা কন্টিনজেন্টের প্যারেড কমান্ডার মীর এম আসালাতসহ স্বাধীনতা যুদ্ধের বিভিন্ন সেক্টর ও মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডাররা এতে অংশ নেন। নবম পদাতিক ডিভিশন এর আয়োজন করে। জেনারেল মইন উ মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশে আরও বলেন, আমাদের আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সময় হয়েছে। আসুন আমরা আবার অন্যায়, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই করি। দেশকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন করি, সুন্দর করি। তিনি স্বাধীনতার যুদ্ধ বাস-বায়নে দুর্নীতিসহ সব ধরনের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাসহ সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।

সেনাবাহিনী প্রধান মুক্তিযোদ্ধাদের দেশের গর্বিত সন্তান উল্লেখ করে বলেন, এদেশকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলার জন্য আমাদের সবাইকে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি। সেনাপ্রধান উপস্থিত সব মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে মতবিনিময় করেন এবং তাদের কুশলাদি সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। অনুষ্ঠানে মেজর জেনারেল (অব.) মুহাম্মদ ইবরাহীম মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিরোধিতাকারী রাজাকারদের তালিকা প্রণয়নের দাবি জানিয়ে বলেন, আমরা এখনও প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাও করতে পারিনি। এবার আমরা চাই রাজাকারের তালিকা করা হোক।

নবম পদাতিক ডিভিশনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধানের এ ধরনের মহতী অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য বাংলাদেশের প্রথম সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) কেএম শফিউল্লাহ সবার পক্ষ থেকে তাকে ব্যক্তিগত শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ জানান।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীসহ ঊর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
Source:দৈনিক যুগান্তর
Date:2007-03-28

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: