তারেক রহমানকে ‘মামা’ ডাকতেন বাংলাভাই

বিএনপি-জামাত নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী-এমপি-নেতাদের প্রত্যক্ষ মদদেই কুখ্যাত বাংলাভাই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছিলেন। স্বঘোষিত আঞ্চলিক শাসন জারি করে রাজশাহীর বাগমারা ও নওগাঁর আত্রাই-রানীনগরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সন্ত্রাসের রামরাজত্ব কায়েম করেছিলেন। জোট নেতাদের সঙ্গে বাংলাভাইয়ের সম্পর্কের গভীরতা এতোটাই বেশি ছিল যে, জনসমক্ষে তারেক রহমানকে মোবাইল ফোনে তিনি ‘মামা’ বলে সম্বোধন করতেন। কুখ্যাত বাংলাভাই ও শায়খ রহমানসহ শীর্ষ ৬ জঙ্গির ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পরও জঙ্গি মদদদাতারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছে। জঙ্গিবাদে মদদদানের অভিযোগে জোট সরকারের সাবেক ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হক, সাবেক ভূমি উপমন্ত্রী র”হুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, সাবেক সাংসদ নাদিম মোস্তফা ও রাজশাহী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শীশ মোহাম্মদের বির”দ্ধে রাজশাহীর বাগমারা ও নাটোরের নলডাঙ্গা থানায় পৃথক পৃথক তিনটি মামলা দায়েরের পরও পুলিশ এখনো এদের গ্রেপ্তার অভিযানে নামেনি। এদের মধ্যে কেবল সাবেক ভূমি উপমন্ত্রী র”হুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বর্তমানে ত্রাণের টিন আত্মসাতের মামলায় কারাগারে আটক রয়েছেন। বাকিরা পলাতক।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায় আসার পর দুলু ও নাদিমের ক্যাডার বাহিনী রাজশাহীর পুঠিয়া, দুর্গাপুর ও নাটোরের নলডাঙ্গাসহ বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। নাদিম-দুলু বাহিনীর হাতে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ নির্যাতিত হতে থাকে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এদের নির্যাতনের হাত থেকে সাধারণ মানুষদের রক্ষা করেনি, উল্টো নাদিম-দুলু বাহিনীকে প্রকাশ্যে সহযোগিতা দিয়ে গেছে, পুলিশের নির্লিপ্ত ভূমিকায় সাধারণ মানুষ অসহায় হয়ে পড়ে।

এ অবস্থায় ২০০৪ সালের ফেব্রচ্ছারি মাসে নাদিম-দুলু বাহিনীর বিরুদ্ধে সর্বহারা ক্যাডাররা ঘোষণা দিয়ে অ্যাকশনে নামে। ৭ ফেব্রচ্ছারি সন্ধ্যায় নাটোরের নলডাঙ্গা এলাকায় সর্বহারা ক্যাডাররা সাবেক ভূমি উপমন্ত্রী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর ভাতিজা সন্ত্রাসী গামাকে গুলি ও জবাই করে হত্যা করে। এরপর তারা পুঠিয়ার সাধনপুরে নাদিম মোস্তফার ঘনিষ্ঠ সহযোগী যুবদলের সন্ত্রাসী পাখি ও দুর্গাপুর বাজারে প্রকাশ্য দিবালোকে যুবদলের সন্ত্রাসী ওয়ার্ড কমিশনার আনোয়ারকে খুন করে। এসব সন্ত্রাসী খুন হওয়ার পর এলাকাবাসী স্বস্তি প্রকাশ করে এবং অনেক স্থানেই তারা মিষ্টি বিতরণ করে। এসব সন্ত্রাসীকে খুন করার কারণে সর্বহারাদের প্রতি জনসমর্থন বেড়ে যায়। কারণ নাদিম-দুলুর পোষা এসব দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে মানুষ দিনের পর দিন থানায় ধর্না দিয়েও কোনো ফল পায়নি।

সর্বহারা ক্যাডাররা জনসমর্থনকে পুঁজি করে এসব এলাকায় ব্যাপকহারে সংগঠিত হওয়ার এক পর্যায়ে ২০০৪ সালের ফেব্রচ্ছারি মাসের শেষের দিকে সন্ত্রাসীদের গডফাদার দুলু ও নাদিমকে হত্যার হুমকি দেয়। এ হুমকিতে দুলু এবং নাদিম বিচলিত হয়ে পড়েন। তারা প্রথমে সর্বহারাদের সঙ্গে সমঝোতায় আসার চেষ্টা চালান। এর অংশ হিসেবে ২০০৪ সালের মার্চ মাসে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে সর্বহারাদের সঙ্গে সিরিজ বৈঠক হয়। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে সমঝোতা প্রক্রিয়া অনেক দূর এগিয়ে যাওয়ার পরও এক পর্যায়ে ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল সর্বহারাদের শায়েস্তা করার জন্য কুখ্যাত বাংলাভাই ও তার বাহিনীকে নাদিম ও দুলু মাঠে নামিয়ে দেন। এর ফলে সমঝোতা ভেঙে যায়। এর জন্য নাদিম-দুলু ও সর্বহারারা একে অপরকে দায়ী করেন। সে সময় সর্বহারাদের কবল থেকে জীবনরক্ষার কথা বলা হলেও সুদূরপ্রসারি পরিকল্পনা হাতে নিয়েই এদের মাঠে নামানো হয়েছিল বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। সূত্র মতে, জাতীয় নির্বাচনকে টার্গেট করেই তাদেরকে মাঠে নামনো হয়। নির্বাচনের আগেই পুলিশ বাহিনীকে অকার্যকর রেখে বাংলাভাই ও তার জঙ্গি বাহিনীকে দিয়ে মাঠ দখলে রাখতে চেয়েছিল হাওয়া ভবনের কর্নধাররা। তাদের পরিকল্পনা ছিল, দুইএকজন কথিত সর্বহারাকে নির্যাতনের পাশাপাশি ব্যাপকহারে আওয়ামী লীগ ও সমমনা দলগুলোর নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করা যাতে তারা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায় ।

অপারেশনের প্রথম দিকে জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমজেবি) তথা বাংলাভাই বাহিনী সর্বহারাদের বিরুদ্ধে লোক দেখানো অভিযান শুরু করে জনসমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালায়। অপারেশন শুরুর প্রথম দিনই তারা বাগমারার পলাশী গ্রামে ওসমান বাবু নামের এক যুবককে শত শত মানুষের সামনে প্রকাশ্যে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করে। এরপর ধীরে ধীরে তারা বাগমারা, আত্রাই, রানীনগর ও নলডাঙ্গা এলাকায় নির্যাতন ক্যাম্প স্থাপন করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ এলাকার সাধারণ মানুষদের ওপর চরম নির্যাতন চালায়। তারা মাত্র পৌনে ২ মাসে অন্তত ২২ জনকে খুন করে এবং শত শত মানুষকে নির্যাতন করে পঙ্গু করে দেয়। এর পাশাপাশি তারা এলাকায় ব্যাপক লুটপাট চালাতে থাকে। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকরা নেপথ্যে থাকায় পুলিশ প্রশাসনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় নিয়েই বাংলাভাই ও তার ক্যাডার বাহিনী এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাবেক জোট সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট হয়েই বাংলাভাই মাঠে নেমেছিল। নাটোর, নওগাঁ ও রাজশাহীর তৎকালীন পুলিশ সুপাররা সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে বাংলা বাহিনীকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দেন। সাবেক উপমন্ত্রী দুলু ও সাবেক সাংসদ নাদিম মোস্তফা হাওয়া ভবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকায় হাওয়া ভবনের মাধ্যমে বাংলা বাহিনী প্রশাসনিক ও আর্থিক সর্বপ্রকারের সহযোগিতা পায়। রাজশাহী রেঞ্জের তৎকালীন ডিআইজি (বর্তমান আইজি) নূর মোহাম্মদ বাংলাভাইকে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নিলে নাদিম, দুলু ও হাওয়া ভবনের চাপে তাকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়। ফলে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বাংলা বাহিনীর বিরুদ্ধে তিনি অ্যাকশনে যেতে পারেননি। রাজশাহী ও নওগাঁ জেলার তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে ব্যারিস্টার আমিনুল হক কুখ্যাত বাংলা বাহিনীকে সর্বাত্মক সমর্থন দিয়েছেন। ব্যারিস্টার আমিনুল হক রাজশাহী ও নওগাঁ জেলার আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বাংলাভাই বিষয়টি আলোচনা পর্যন্ত করতে দেননি। বাংলা বাহিনীর নির্যাতনকালে বাগমারা থানার তৎকালীন কোনো পুলিশ সদস্য বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে স্বয়ং বাংলাভাই তাদের মোবাইল ফোন দিয়ে বলতেন ‘তোর বাপের সঙ্গে কথা বল’। এরপর ওই পুলিশ সদস্য নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতেন।

প্রত্যক্ষদর্শী ও নির্যাতিতরা অনেকেই জানিয়েছেন, অভিযানকালে বাংলাভাই প্রতি দিনই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান, ভূমি উপমন্ত্রী র”হুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু ও সাংসদ নাদিম মোস্তফার সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলতেন। সেসব কথোপকথনের সময় বাংলাভাই তার অপারেশনের বিস্তারিত বিবরণ দিতেন। মোবাইল ফোনে বাংলাভাই তারেক রহমানকে মামা বলে সম্বোধন করতেন। দুলু ও নাদিম জেএমবি তথা বাংলা বাহিনীর পক্ষে সংবাদ প্রচারের জন্য মোটা অংকের বাজেট বরাদ্দ করেছিলেন । এ ব্যাপারে অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেছে, শুধুমাত্র বিএনপি নেতা ফালুর এনটিভি ও দৈনিক ইত্তেফাকে বাংলাভাইয়ের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করে সংবাদ প্রচার করা সম্ভব হয়। এনটিভির সংবাদে বাংলা ভাইকে ‘শান্তির দূত’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। বাংলাভাইয়ের অভিযানকালে ব্যাপকভাকে প্রচার চালানো হয় যে, ‘বাংলা ভাই সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার লোক এবং যা কিছু হচ্ছে তা সরকারই করাচ্ছে।’ বাংলাভাইয়ের লোমহর্ষক অপারেশনগুলো চলার সময় নাদিম মোস্তফার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু (নামের আদ্যাক্ষর ‘র’) প্রায়ই রাজশাহী প্রেসক্লাবে এসে সাংবাদিকদের সঙ্গে লিয়াজোঁ করতেন। ওই বন্ধুটি অভিযান চলার সময় রাজশাহীর কয়েকজন সাংবাদিককে কয়েকবার বাংলাভাইয়ের কাছে নিয়ে গেছেন। হরতালের দিনেও পুলিশ প্রোটেকশনে একবার বাংলাভাইয়ের কাছে সাংবাদিকদের নিয়ে যাওয়া হয়।

রাজশাহী জেলা গোয়েন্দা পুলিশের এএসআই ওবায়দুরকে (বর্তমানে ঢাকায় র‌্যাবে কর্মরত) জিজ্ঞাসাবাদ করলে জঙ্গি মদদদাতাদের সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যাবে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের একাধিক সদস্য জানিয়েছেন। তারা আরো জানান, ঢাকা থেকে দুলু ও নাদিম ফোনে রাজশাহীর তৎকালীন এসপি মাসুদ মিয়াকে নির্দেশ দিতেন।

বাংলাভাইয়ের নির্যাতনের ঘটনাগুলো ধারাবাহিকভাবে জাতীয় পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার এক পর্যায়ে দুলু ও নাদিমের পরামর্শক্রমে রাজশাহীর তৎকালীন এসপি মাসুদ মিয়া (বর্তমানে চাকুরিচ্যুত) বাংলাভাইয়ের সঙ্গে এক গোপন বৈঠকে মিলিত হন। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, বাংলাভাই এবং তার ক্যাডার বাহিনী রাজশাহী মহানগরীতে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ব্যাপক শোডাউন করবে। সেখানে আরো সিদ্ধান্ত হয় যে, বাংলাভাইয়ের ওই শোডাউনে পুলিশ সার্বক্ষণিক প্রোটেকশন দেবে। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০০৪ সালের ২৩ মে দুপুরে বাংলাভাই ও তার জঙ্গি ক্যাডার বাহিনী বাগমারা, আত্রাই, রানীনগর ও বগুড়ার কিছু অঞ্চল থেকে অস্ত্রশস্ত্র ও ক্যাডার বাহিনী বাসে-ট্রাকে নিয়ে এসে রাজশাহী মহানগরীতে পুলিশি প্রোটেকশনে ব্যাপক শোডাউন করে। এ শোডাউনের টাকা দুলু-নাদিম ছাড়াও বিএনপির কয়েকজন নেতা জোগান দিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, এ শোডাউনের কারণে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েন। ওই দিনই (২০০৪ সালের ২৩ মে) তিনি বাংলাভাইকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিলে পর দিন ২৪ মে সন্ধ্যায় বাংলাভাই কয়েকজন ক্যাডারসহ রানীনগর পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। কিন’ তৎকালীন মন্ত্রী আমিনুল হক, প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবির, উপমন্ত্রী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু ও সাংসদ নাদিম মোস্তফার চাপে বাংলাভাই ও তার ক্যাডার বাহিনীকে ছেড়ে দিতে পুলিশ বাধ্য হয়। এ ঘটনায় রানীনগর থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মশিউর রহমানকে সাসপেন্ড করা হয়।

বাংলাভাই ও শায়খ রহমানসহ শীর্ষ ৬ জঙ্গির ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর রাজশাহীর বাগমারা ও নওগাঁর আত্রাই-রানীনগর এলাকার বাংলাভাইয়ের হাতে নির্যাতিতদের প্রশ্ন ‘জঙ্গি বাংলাভাইয়ের মদদদাতারা কি ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাবে?’ সকলে আশা করছেন বর্তমান নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার জঙ্গিবাদের মূলোৎপাটনে এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে। Source:ভোরের কাগজ
Date:2007-04-05

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: