শামীম ওসমান ও মামুনের বিরুদ্ধে মামলা : কাজী বাবুল গ্রেফতার

নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমান এবং বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের বিরুদ্ধে বুধবার মামলা হয়েছে। নোটিশ প্রদানের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সম্পদের হিসাব না দেয়ায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নারায়ণগঞ্জের আদালতে শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে চাঁদাবাজির মামলা। তার বিরুদ্ধে ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা চাঁদাবাজির মামলা করেছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীর আখতার হোসেন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর জাহির হোসেন। দুদকও তার বিরুদ্ধে মামলা করছে। মামুনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী কাজী নাসিরউদ্দিন বাবুলকে অবৈধ অস্ত্রসহ গ্রেফতার করা হয়েছে। মামুনকে আদালতে হাজির করা হবে।

নোটিশ প্রদানের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সম্পদের হিসাব না দেয়ায় হারিছ চৌধুরী, গিয়াসউদ্দিন আল মামুন, শামীম ওসমান ও জয়নাল হাজারীর বিরুদ্ধে ‘নন সাবমিশন’ মামলার প্রক্রিয়া শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। বুধবার দুদকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নারায়ণগঞ্জের আদালতে শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলে বিচারক মামলাটি গ্রহণ করে আগামী ১০ এপ্রিলের মধ্যে অভিযুক্ত শামীম ওসমানকে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়ে পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেন। হারিছ চৌধুরী ও গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের বিরুদ্ধে আদালতের কর্মদিবসের শেষভাগে মামলা করতে গিয়েছিলেন দু’জন দুদক কর্মকর্তা। তবে আদালত তাদের ফিরিয়ে দিয়েছেন। আজ হারিছ চৌধুরী ও মামুনের বিরুদ্ধে ‘নন সাবমিশন’ মামলা দেবে দুদক। ফেনীতেও মামলা করা হবে জয়নাল হাজারীর বিরুদ্ধে।

আমাদের নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে বুধবার জেলা দুর্নীতি দমন অফিস মামলাটি করে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পত্তির হিসাব দুর্নীতি দমন কমিশনে দাখিল না করায় এ মামলা করা হয়। নারায়ণগঞ্জের বিশেষ জজ আবদুল কুদ্দুস মিয়ার আদালতে দুর্নীতি দমন কমিশনের নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মোঃ বেনজীর আহম্মদ মামলাটি করেন।
শামীম ওসমানের পরিবারের সদস্যের নামে থাকা সম্পত্তির হিসাব দাখিলের জন্য ১৮ ফেব্রুয়ারি দুদক থেকে নোটিশ প্রদান করা হয়। নোটিশটি শামীম ওসমানের অনুপস্থিতিতে তার ৪৬/৬ নম্বর নিউ চাষাঢ়া, জামতলা হোল্ডিংয়ের বাড়ির গেটে লাগিয়ে দেয়া হয়। নোটিশে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে শামীম ওসমানকে সশরীরে উপস্থিত হয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে সম্পত্তির হিসাব দিতে বলা হয়েছিল। কিন’ এ সময়ের মধ্যে শামীম ওসমান সশরীরে উপস্থিত হয়ে তার সম্পত্তির হিসাব দেননি; যা দুর্নীতি দমন কমিশন আইন এবং জরুরি বিধিমালা আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

দুদক কর্মকর্তা বেনজীর আহম্মদ জানান, আদালত মামলাটি গ্রহণ করে শামীম ওসমানকে মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখের মধ্যে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন। মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ আগামী ১০ এপ্রিল। দীর্ঘ পাঁচ বছর দেশের বাইরে পালিয়ে থাকার পর শামীম ওসমান ২৬ ডিসেম্বর দেশে ফিরে আসেন। এর কয়েকদিন পরেই শামীম ওসমান আবার দেশ ছেড়ে চলে যান। দুর্নীতি দমন কমিশন ঘোষিত প্রথম ৫০ জন দুর্নীতিবাজের অন্যতম শামীম ওসমান। সশরীরে দুদকের নোটিশের বিষয় জানার পর শামীম ওসমান তার আইনজীবীর মাধ্যমে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে এবং কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে তার সম্পত্তির হিসাব পাঠান দুদকে। তবে তিনি সশরীরে হাজির না হওয়ায় তার এ হিসাব গ্রহণ করা হয়নি।
এদিকে আমাদের ঢাকা জজকোর্ট রিপোর্টার জানান, আদালতের কার্যদিবসের শেষভাগে হারিছ চৌধুরী ও গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে না পেরে ফিরে গেছেন দুদকের উপ-পরিচালক আবু সাঈদ ও সহকারী পরিচালক আকতার হামিদ ভূঁইয়া।

বুধবার বিকাল ৩টায় তারা ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ মোঃ মমিনউল্লাহর আদালতে দুদক আইনে হারিছ চৌধুরী ও মামুনের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত সংক্রান- মামলা করতে এলে বিচারক তাদের বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টায় মামলা দায়েরের নির্ধারিত সময়ে আসতে বলেন।
দুদক ঘোষিত নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পদের হিসাব দাখিল না করায় সাবেক প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী ও তারেক রহমানের ব্যবসায়িক পার্টনার গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের সব সম্পত্তির ক্রোকাদেশ সংক্রান- মামলা দায়েরের একটি চিঠি দেয়া হয় আদালতে। বেলা ২টায় দুদকের বিশেষ বাহকের মাধ্যমে এই চিঠি ওই আদালতের নাজিরের কাছে পৌঁছানো হয়। এর কিছুক্ষণ পর দুদকের কর্মকর্তারা এজলাসে এসে পৌঁছলে কোর্ট নাজির চিঠিটি বিচারকের খাস কামরায় নিয়ে যান। বিচারক চিঠি পেয়ে দুদক কর্মকর্তা ও নিয়োগপ্রাপ্ত আইনজীবীদের খাস কামরায় ডেকে বৃহস্পতিবার সকালে মামলা দায়েরের নির্ধারিত সময়ে আসতে বলেন। জানা গেছে, মামলা দুটি ‘নন সাবমিশন’ কেইস হিসেবে দায়ের হবে। পরে দুদক তাদের সম্পত্তি ক্রোক করবে।

গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের বিরুদ্ধে ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা চাঁদাবাজির এ মামলা দায়ের করেছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীর আখতার হোসেন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর জাহির হোসেন। মামলায় গিয়াসউদ্দিন আল মামুন ছাড়াও তার ৬ সহযোগীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ নিয়ে গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও অস্ত্র আইনে মোট ৫টি মামলা হল। গুলশান থানায় দায়েরকৃত ১ কোটি ৩২ লাখ টাকা চাঁদাবাজির মামলায় ৫ দিনের রিমান্ড শেষে মামুনকে আজ আদালতে হাজির করা হবে। গুলশান থানায় দায়ের করা অপর একটি চাঁদাবাজির মামলায় তাকে রিমান্ডে নেয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া গুলশান থানা পুলিশ মঙ্গলবার রাতে গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী কাজী নাসিরউদ্দিন বাবুলকে অবৈধ অস্ত্রসহ গ্রেফতার করেছে। বুধবার পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৩ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে।
ধানমণ্ডি থানায় দায়ের করা মামলায় মীর আখতার হোসেন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর জাহির হোসেন বলেছেন, ২০০৫ সালের শেষদিকে গিয়াসউদ্দিন আল মামুন তাকে ফোন করে তিন কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন। ওই টাকা না দিলে তাদের প্রতিষ্ঠানের সব কাজ বন্ধ করে দেয়া হবে বলে জানানো হয়। টাকা দিতে রাজি না হলে তাকে প্রাণনাশেরও হুমকি দেন গিয়াসউদ্দিন আল মামুন। কিন’ তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও হাওয়া ভবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকায় তিনি বিষয়টি কাউকে জানাতে পারেননি। মামলায় তিনি বলেন, হুমকির মুখে তিনি ২০০৬ সালের ৭ জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন- বিভিন্ন ব্যাংকে চেকের মাধ্যমে গিয়াসউদ্দিন আল মামুনকে মোট ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা চাঁদা দিয়েছেন। মামলায় গিয়াসউদ্দিন আল মামুন ছাড়াও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ওবায়দুল্লাহ, কামরুজ্জামান, মাহবুব, হাবলু, মোটা তারেক ও মানিককে আসামি করা হয়েছে। মামলা নম্বর ১২। ধারা ৩৮৫/৩৮৬ ও ৩৮৭ বাংলাদেশ দণ্ডবিধি।

পুলিশ মঙ্গলবার রাতে গুলশান ১ নম্বর সেকশনের ১ নম্বর রোডের ২০ নম্বর বাড়ি থেকে গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী কাজী নাসিরউদ্দিন বাবুলকে গ্রেফতার করে। ঠিকাদারি ব্যবসার নামে সে গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের সঙ্গে চাঁদাবাজি করত বলে পুলিশ জানিয়েছে। অবৈধ অস্ত্রসহ গ্রেফতারের পর পুলিশ তাকে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এবিএম আবদুল ফাত্তাহর আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানায়। আদালত কাজী নাসির উদ্দিন বাবুলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। গ্রেফতারকৃত বাবুল গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় দায়ের হওয়া ৮১ লাখ টাকা চাঁদাবাজি মামলারও এজাহারভুক্ত আসামি। Source:দৈনিক যুগান্তর
Date:2007-04-05

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: