শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ৩ কোটি টাকার চাঁদাবাজি মামলা

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ৩ কোটি টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা হয়েছে। রাজধানীর তেজগাঁও থানায় সোমবার দায়েরকৃত এ মামলায় শেখ হাসিনার সাবেক ব্যক্তিগত স্টাফ মানু মজুমদারকেও আসামি করা হয়েছে। মামলার এজাহারে বলা হয়, আওয়ামী লীগ শাসনামলে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন গণভবনে বসেই চাঁদার টাকা গ্রহণ করেন। ১৯৯৮ সালের ১২ ডিসেম্বর চাঁদার টাকা লেনদেন হয়। বাংলাদেশ বার্জ মাউন্টেড পাওয়ার প্লান্টের কান্ট্রি ডিরেক্টর ও ওয়েস্ট মন্ট অবসো বাংলাদেশ লিমিটেডের চেয়ারম্যান কাজী তাজুল ইসলাম ফারুক বাদী হয়ে তেজগাঁও থানায় মামলাটি দায়ের করেন। মামলা নম্বর ৩০। ধারা-৩৮৫/৩৮৬/৩৮৭ ও ১০৯ বাংলাদেশ দণ্ডবিধি। বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক জানান, এটি দণ্ডবিধির জামিন অযোগ্য ধারা। ৩৮৫ ধারায় ৭ বছর থেকে ১৪ বছর, ৩৮৬ ধারায় ৫ বছর থেকে ১০ বছর ও ৩৮৭ ধারায় ৭ বছর থেকে যাবজ্জীবন সাজার বিধান রয়েছে। পুলিশ জানায়, বাদী এজাহারে উল্লেখ করেছেন এতদিন নানা ভয়ভীতির কারণে তিনি মামলা করতে পারেননি। ক্ষমতার পালাবদলে উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ায় দেরিতে হলেও তিনি থানায় মামলা করলেন। কাজী তাজুল ইসলাম ফারুক মামলায় বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে ১৯৯৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর বেসরকারি বিদ্যুৎ প্লান্ট তৈরির জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে। এ সময় তিনি মালয়েশিয়ান কোম্পানি ওয়েস্ট মন্ট অবসোর সঙ্গে যোগাযোগ করে দরপত্রে অংশগ্রহণ করেন। তিনি বলেন, নিউ ইংল্যান্ড ও স্মিথসহ আরও একটি বেসরকারি কোম্পানি দরপত্রে অংশ নেয়। সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে তাদের প্রতিষ্ঠান বাঘাবাড়ীতে পাওয়ার প্লান্ট তৈরির জন্য মনোনীত হয়। কাজী তাজুল ইসলাম ফারুক এজাহারে বলেছেন, এরপর মালয়েশিয়ান কোম্পানি ওয়েস্ট মন্ট অবসো লিমিটেড বাংলাদেশে অফিস স্থাপন করে। ৪৫ নিউ ইস্কাটনে কোম্পানির অফিস নেয়া হয়। তিনি কোম্পানির কান্ট্রি ম্যানেজার হিসেবে বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। অন্যদিকে বাংলাদেশ বার্জ মাউন্টেড পাওয়ার প্লান্টের অফিস নেয়া হয় গুলশানের ১২৪ নম্বর রোডের ৭/এ নম্বর বাড়িতে। কোম্পানির দু’জন ডিরেক্টর হচ্ছেন মালয়েশিয়ান নাগরিক মি. হাং ভাং ও সিও কাইসিং।

কাজী তাজুল ইসলাম ফারুক বলেন, ১৯৯৭ সালের ৭ মার্চ পাওয়ার প্লান্ট নির্মাণে সরকারের সঙ্গে তাদের কোম্পানির লিখিত চুক্তি হয়। এরপরই কোম্পানি বাঘাবাড়ীতে পাওয়ার প্লান্ট স্থাপনের কাজ শুরু করে। কিন্তু ১৯৯৮ সালে পাওয়ার প্লান্ট তৈরির কাজ বিলম্ব হয়। মামলায় উল্লেখ করা হয়, ওই বছরের ২২ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত স্টাফ পরিচয়ে মানু মজুমদার তাকে ফোন করে দেখা করার কথা বলেন। তিনি মানু মজুমদারের সঙ্গে দেখা করেন। এ সময় মানু মজুমদার তার কাছে পাওয়ার প্লান্ট স্থাপন বাবদ ৩ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন। ওই টাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চেয়েছেন বলে মানু মজুমদার তাকে জানান। এ কথা শোনার পর তিনি মানু মজুমদারকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করে দিতে বলেন। এর কয়েকদিন পরই মানু মজুমদার তাকে ফোন করে ২৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে বলেন।

কাজী তাজুল ইসলাম ফারুক মামলায় বলেন, ২৪ জুলাই সন্ধ্যার একটু আগে মানু মজুমদার একটি পাজেরো জিপে করে গুলশানের ১২৪ নম্বর রোডে তার অফিসে আসেন। আগের দেয়া সময় অনুযায়ী সন্ধ্যা ৭টার দিকে মানু মজুমদারের সঙ্গে এক গাড়িতে করে তেজগাঁওয়ে গণভবনে যান। এ সময় তিনি তার বন্ধু শহীদ ও বাসেদকে বিষয়টি জানান এবং তার দিকে খেয়াল রাখতে বলেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে তার সঙ্গে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাৎ হয়। এ সময় শেখ হাসিনা তাকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘বড় বড় কাজে সবাই চাঁদা দেয়, আপনি দিলেন না কারণ কি? কাজ করতে হলে চাঁদা দিতে হবে। এ সময় শেখ হাসিনা কাজী তাজুল ইসলাম ফারুকের কাছে ৩ কোটি টাকা দাবি করেন। বলেন, টাকা না দিলে কাজ বন্ধ করে দেয়া হবে। আরও অভিযোগ করা হয়েছে, হাত-পা ভেঙে জেলে পাঠানোর হুমকিও দেন শেখ হাসিনা।’
কাজী তাজুল ইসলাম ফারুক টাকা দেয়ার জন্য শেখ হাসিনার কাছে এক মাস সময় প্রার্থনা করেও সে সময় পাননি বলে মামলায় উল্লেখ করেছেন। গণভবন থেকে বের হয়ে তিনি সরাসরি অফিসে এসে তার কোম্পানির দুই পরিচালককে ঘটনা খুলে বলেন। যেহেতু তাদের পাওয়ার প্লান্টে অনেক টাকা বিনিয়োগ করা হয়ে গেছে তাই ৩ কোটি টাকা দেয়া ছাড়া তাদের আর কোন উপায় ছিল না।

কাজী তাজুল ইসলাম ফারুক মামলায় আরও বলেন, ১৯৯৮ সালের ১২ ডিসেম্বর তিনি একটি কালো বড় আকৃতির স্যুটকেসে নগদ ৩ কোটি টাকা নিয়ে গণভবনে গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে তার কাছে দিয়ে আসেন। এ সময় সেখানে শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত স্টাফ মানু মজুমদার উপস্থিত ছিলেন। টাকা দেয়ার পর তিনি গণভবন থেকে বেরিয়ে আসেন। কাজী তাজুল ইসলাম ফারুক এক বন্ধুকে নিয়ে সোমবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে তেজগাঁও থানায় যান। সরাসরি ওসির কক্ষে গিয়ে নিজের পরিচয় দেয়ার পর টাইপ করা তিন পৃষ্ঠার অভিযোগ জমা দেন। এরপর ওসি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিকাল সাড়ে ৫টায় অভিযোগটি এজাহার হিসেবে গণ্য করেন। সাংবাদিকরা কাজী তাজুল ইসলাম ফারুকের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি বলেন, মামলার এজাহারে সব উল্লেখ করা আছে। এ ব্যাপারে তিনি পুলিশের সঙ্গে কথা বলতে অনুরোধ করেন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে দেশের বাইরে রয়েছেন। ১৫ মার্চ তিনি ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের অসুস্থ স্ত্রীকে দেখতে যুক্তরাষ্ট্র যান। আগামী ২৭/২৮ এপ্রিল তার দেশে ফেরার কথা রয়েছে। ঢাকা থেকে একাধিক সূত্র শেখ হাসিনার সঙ্গে মামলার বিষয়ে তার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি এতে বিস্ময় প্রকাশ করেন।
দলীয় সভানেত্রীর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ঘটনায় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানার জন্য আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বলেন, আগে বিষয়টি সম্পর্কে পুরোপুরি জেনে তারপর মন্তব্য করবেন। দলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল বলেন, যে সময়ের ঘটনার সূত্র ধরে এই মামলাটি হয়েছে তারপর একটি সরকার ৫ বছর ক্ষমতায় ছিল। সে সময় না হয়ে এখন কেন মামলা হল, এই বিষয়টি আগে খতিয়ে দেখা দরকার বলে মন-ব্য করেন তিনি। দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন- কে, কেন, কি উদ্দেশ্যে এই মামলা করেছে তার পুরো বিবরণ না জেনে তিনি কোন মন্তব্য করতে পারছেন না। Source:দৈনিক যুগান্তর
Date:2007-04-10

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: