দুই বিচারক হত্যা মামলার পিপি গুলিতে নিহত

ঝালকাঠিতে দুই বিচারক হত্যা মামলার প্রধান কৌঁসুলি জেলা জজকোর্টের পিপি অ্যাডভোকেট হায়দার হোসাইনকে (৫৫) গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। বুধবার রাত সাড়ে ৮টায় ঝালকাঠি শহরের গোরস্থান রোড এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। রাত ৯টায় বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (শেবাচিম) আনার পর কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। জেএমবির ৬ শীর্ষ জঙ্গির ফাঁসি কার্যকর হওয়ার মাত্র ১২ দিনের মাথায় নৃশংস এ হত্যাকাণ্ড ঘটল। এর আগে নিজের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়ে বিভিন্ন জায়গায় বলেছিলেন হায়দার হোসাইন। প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিনের মতো গতকালও গোরস্থান রোড মসজিদে এশার নামাজ পড়তে যান হায়দার হোসাইন। নামাজ শেষে রাত সাড়ে ৮টা নাগাদ মসজিদ থেকে বাইরে আসেন তিনি। অন্য মুসল্লিদের তুলনায় খানিকটা আগেই তিনি মসজিদ থেকে বেরুনোর পরপরই একটি গুলির শব্দ শুনতে পায় আশপাশের লোকজন। তাৎক্ষণিকভাবে মুসল্লিসহ অন্যরা ছুটে এসে তাকে রাস্তার ওপর পড়ে থাকতে দেখেন। খবর পেয়ে পুলিশসহ পরিবারের লোকজন সেখানে পৌঁছে তাকে অ্যাম্বুলেন্সযোগে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন। রাত ৯টা নাগাদ এখানে পৌঁছার পর কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

শেবাচিম হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা জানান, নিহত হায়দার হোসাইনের শরীরে একটিমাত্র গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। কপালের সামনে দিয়ে ঢুকে পেছন দিক দিয়ে বেরিয়ে গেছে গুলি। এছাড়া তার শরীরের আর কোথাও কোন ক্ষতচিহ্ন ছিল না। ধারণা করা হচ্ছে, আগে থেকে ওঁৎ পেতে থাকা খুনিরা খুব কাছ থেকে তার মাথায় গুলি করে পালিয়ে যায়। গোরস্থান রোড এলাকার বাসিন্দারা জানান, ঘটনার সময় ওই এলাকায় বিদ্যুৎ থাকলেও মসজিদের সামনের লাইটপোস্টটিতে কোন বাতি ছিল না। ফলে জায়গাটি ছিল মোটামুটি অন্ধকারাচ্ছন্ন। লোকজন সেখানে ছুটে আসার পর আশপাশে অপরিচিত কাউকে দেখতে পাওয়া যায়নি।

এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কারা জড়িত রয়েছে তা জানা না গেলেও প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, জেএমবি’র জঙ্গিরাই এ ঘটনা ঘটিয়েছে। ৬ শীর্ষ জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার প্রতিশোধ হিসেবে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হতে পারে। এ ব্যাপারে জীবিত অবস্থায় অ্যাডভোকেট হায়দার হোসাইনের দেয়া নানা বক্তব্যকেও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ৩০ মার্চ ৬ শীর্ষ জঙ্গির ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর থেকেই তাকে নানাভাবে হত্যার হুমকি দেয়া হচ্ছিল বলে পরিচিতজনদের জানিয়েছিলেন তিনি। মঙ্গলবার ঝালকাঠিতে যশোর ক্যান্টনমেন্টের জিওসি মেজর জেনারেল রফিকুল ইসলামের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে নিজের নিরাপত্তাহীনতার কথা বলেন অ্যাডভোকেট হায়দার হোসাইন।

২০০৫ সালের ১৪ নভেম্বর ঝালকাঠিতে জেএমবি’র বোমা হামলায় সিনিয়র সহকারী জজ জগন্নাথ পাঁড়ে এবং সোহেল আহম্মেদ নিহত হন। ওই ঘটনায় ঝালকাঠি জজকোর্টে দায়ের হওয়া হত্যা মামলার প্রধান কৌঁসুলি ছিলেন অ্যাডভোকেট হায়দার হোসাইন। বিচারক হত্যার এ ঘটনায় জেএমবি প্রধান শায়খ আবদুর রহমান এবং সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাইসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল হয় ২০০৬ সালের ২১ মার্চ। ওই বছরের ১৮ এপ্রিল ঝালকাঠি জেলা ও দায়রা জজ আদালতে ৬ জন আসামির উপসি’তিতে মামলার অভিযোগ আমলে নেয়া হয়। ২৩ এপ্রিল অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতে গঠন করা হয় অভিযোগ। ১৫ মে আদালত আসামিদের বক্তব্য শোনেন। ১৮ মে উপস্থাপন করা হয় যুক্তিতর্ক। ৮ কার্যদিবসে মোট ৫৩ জন সাক্ষীর মধ্যে ৪৪ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে ২০০৬ সালের ২৯ মে ৭ শীর্ষ জঙ্গিকে মৃত্যুদণ্ড দেন ঝালকাঠির তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ রেজা আহম্মেদ। এই রায় অনুযায়ীই ৩০ মার্চ ৬ শীর্ষ জঙ্গির ফাঁসি কার্যকর হয়। পুরো এ বিচার প্রক্রিয়ায় সরকার পক্ষে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন অ্যাডভোকেট হায়দার হোসাইন। রায় ঘোষণার দিন বিভিন্ন টিভি চ্যানেলকে দেয়া সাক্ষাৎকারে জেএমবিবিরোধী নানা সাহসী বক্তব্যও দেন তিনি।

অ্যাডভোকেট হায়দার হোসাইনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ঝালকাঠি শহরে শোকের ছায়া নেমে আসে। সেই সঙ্গে শহরবাসীর মধ্যে আতংকও ছড়িয়ে পড়েছে। ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত সজ্জন হিসেবে পরিচিত হায়দার হোসাইন ঝালকাঠি জেলা জামায়াতের সাবেক আমীর। তিনি স্ত্রী, ৪ মেয়ে এবং এক ছেলে রেখে গেছেন। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে ঝালকাঠি সদর আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা অ্যাডভোকেট হায়দার হোসাইন জামায়াতের রাজনীতি করলেও প্রগতিশীল মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তার লাশ ময়নাতদন্তের জন্য বরিশাল হাসপাতাল মর্গে রাখা ছিল। এদিকে ঝালকাঠি থেকে পাওয়া সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের পরপরই পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। জেলা শহরের নিরাপত্তা ব্যবস্তা জোরদার করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের স্থানসহ পুরো এলাকা ঘিরে রেখে তল্লাশি অভিযান চালাচ্ছে র‌্যাব, পুলিশ এবং সেনাবাহিনী। বাইরের কোন লোকজনকে ওই এলাকায় ঢুকতে বা কাউকে বেরুতে দেয়া হচ্ছে না। Source:দৈনিক যুগান্তর
Date:2007-04-12

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: