আরাফাত রহমান গ্রেফতার

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে রোববার রাতে যৌথ বাহিনী গ্রেফতার করেছে। বেগম জিয়ার ক্যান্টমেন্টের ৬, শহীদ মইনুল হোসেন সড়কের বাসভবন থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। রাত সাড়ে ১০ টার পর যৌথ বাহিনীর একটি দল শহীদ মইনুল হোসেন সড়কের আশপাশে অবস্থান নেয়। রাত সাড়ে ১২টার দিকে তারা বেগম জিয়ার বাসভবনের ভেতরে ঢোকে এবং রাত একটার দিকে কোকোকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়।

এর আগে গত ৭ মার্চ সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বড় ছেলে ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব তারেক রহমানকে যৌথ বাহিনী ক্যান্টনমেন্টের বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে। ১ কোটি টাকা চাঁদাবাজির মামলায় ইতিমধ্যেই তারেক রহমানের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। জোট সরকারের পাঁচ বছর বড় ভাই তারেক রহমানের মতো আরাফাত রহমান কোকোও নানা অনৈতিক বাণিজ্য ও দখলবাজিতে জড়িয়ে পড়েন তবে তিনি বড় ভাই তারেক রহমানের মতো রাজনীতির পাদপ্রদীপের আলোয় কখনও আসেননি।

১৯৯১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরই কোকো বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প থেকে কমিশন বাণিজ্য শুরু করেন। পাশাপাশি জড়িত হন ব্যবসায়। গড়ে তোলেন রহমান নেভিগেশন, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি, টেক্সটাইল, বিজ্ঞাপনী সংস্থা। এছাড়া বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে অংশীদার হন। বিমানবন্দর থেকে হোটেল সোনারগাঁও পর্যন্ত সড়কের সব বিলবোর্ড তার বিজ্ঞাপনী সংস্থা ‘এডভান্স’ গত ৫ বছর নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়া ঢাকা-১০ আসনের সাবেক এমপি মোসাদ্দেক আলী ফালুর বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গেও জড়িত হন তিনি। অভিযোগ রয়েছে তিনি নিউ মুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল, কমলাপুরে আইসিডি পোর্ট, মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট প্রকল্প থেকে কমিশন নিয়েছেন। থাইল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার পুত্রের সঙ্গে বন্ধুত্বের সুবাদে চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দর পরিচালনার কন্ট্রাক্ট দেয়ার কাজে বিপুল অংকের কমিশন পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নিয়মনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পাঁচ বছর কোকো রাজপথে গায়ের জোরে অবৈধ বিজ্ঞাপন বাণিজ্য করেছেন অপ্রতিরোধ্য গতিতে। এ ব্যাপারে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের কেউ টুঁ-শব্দ পর্যন্ত করতে পারেননি।
জানা গেছে, আরাফাত রহমান কোকোর বিজ্ঞাপনী সংস্থা অ্যাডভান্স অ্যাড এবং প্রধানমন্ত্রী অফিসের সাবেক মুখ্য সচিব কামালউদ্দিন সিদ্দিকীর মদদপুষ্ট এআরকেএওয়াই গ্রুপ অব কোম্পানি নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো বরাদ্দ নিয়ে নেয়। ডিসিসির বিউটিফিকেশন সেল অ্যাডভান্স অ্যাডকে বরাদ্দ দেয় বিজয় সরণি ফোয়ারা থেকে চীনমৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের পাশ দিয়ে আগারগাঁও লিংক রোড ও বনানীর কাকলী মোড় থেকে মহাখালী রেলক্রসিং হয়ে ক্যান্টনমেন্টের জাহাঙ্গীর গেট পর্যন্ত সড়ক। এআরকেএওয়াই গ্রুপ অব কোম্পানিকে দেয়া হয় শাহবাগ মোড় থেকে শেরাটন মোড়, বাংলামোটর মোড়, সার্ক ফোয়ারা, ফার্মগেট হয়ে মানিক মিয়া এভিনিউ পর্যন্ত সড়ক এবং আনন্দ সিনেমা হলের সামনের সড়ক দ্বীপ ও সোনারগাঁও হোটেলের বিপরীতে পান্থকুঞ্জ পার্ক। বরাদ্দের নীতিমালা অনুযায়ী এসব স্থানে কেবল অ্যাডভান্স অ্যাড এবং এআরকেএওয়াই গ্রুপেরই ছোট সাইজের মাত্র তিনটি বিজ্ঞাপনী বোর্ড টাঙানের কথা। কিন’ প্রতিষ্ঠান দুটি তার ধারধারেনি। তারা তাদের বরাদ্দ পাওয়া সড়কের দর্শনীয় স্থানগুলো বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ভাড়া দেয়। পান্থকুঞ্জে ডিসিসি একটি ‘ক্লক এন্ড টেম্পারেচার টাওয়ার’ তৈরির পরিকল্পনা নিলেও বরাদ্দ গ্রহীতা প্রতিষ্ঠান সেখানে ঘড়ি ও তাপমাত্রা পরিমাপের যন্ত্র না লাগিয়ে টাওয়ারটি ভিন্ন একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দিয়েছে। নীতিমালা ভঙ্গ করে অ্যাডভান্স অ্যাড সার্ক ফোয়ারার সামনে ও এআরকেএওয়াই গ্রুপ ফার্মগেটে আনন্দ সিনেমা হলের সামনে ডিজিটাল এলইডি স্ক্রিন (ভিডিও বিজ্ঞাপন মনিটর) স্থাপন করে। এর পাশাপাশি সড়কগুলোতে আগে থেকেই যেসব প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনী বোর্ড ছিল সেগুলো বিনা কারণে তারা নষ্ট করে ফেলে। এভাবে সৌন্দর্যবর্ধনের নামে সড়ক দখল করে তারা প্রচুর টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। নগরীর রাস্তাগুলো সরেজমিন ঘুরলেই আরাফাত রহমানদের পাঁচ বছরের অরাজকতা চোখে পড়ে। তবে বহু সাইনবোর্ডে চাতুরতার সঙ্গে অ্যাডভান্স অ্যাডের নাম দেয়া হয়নি। ডিসিসিও জানে না এসব বিলবোর্ড-সাইনবোর্ড কারা লাগিয়েছে। তবে যতবারই উচ্ছেদের চেষ্টা করা হয়েছে ততবারই প্রভাবশালী মহল তা থামিয়ে দিয়েছে।

বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পরপরই সারাদেশে সর্বত্র যেসব দখল প্রক্রিয়া শুরু হয় ক্রিকেটও তার বাইরে ছিল না। নির্বাচিত কমিটিকে হটিয়ে আইনের মারপ্যাঁচে উপদেষ্টা কমিটি গঠন করে বিসিবিকে রাতের অন্ধকারে দখল করে নেয় কোকো ও তার দলবল। জীবনে কোনদিন জাতীয় পর্যায়ে ক্রিকেট না খেলেও কোকো হয়ে যান উপদেষ্টা কমিটির অন্যতম সদস্য। সেই সঙ্গে দক্ষ ক্রীড়া সংগঠক সাবের হোসেন চৌধুরীকে সরিয়ে ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যানের পদ করায়ত্ত করেন কোকো। চলতে থাকে ক্রিকেট উন্নয়নের পরিবর্তে নিজের উন্নয়ন। ডিওএইচএসকেন্দ্রিক কিছু উঠতি সন্ত্রাসী ও বন্ধুবান্ধব নিয়ে কোকো গড়ে তোলেন একটি বড় সিন্ডিকেট। গত চার বছর এই সিন্ডিকেটের গ্যাঁড়াকলে আবদ্ধ থাকতে হয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম কিংবা গুলশানস’ নাভানা টাওয়ারের বিসিবি অফিস নয়, ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে কোকোর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান অ্যাডভান্স অ্যাডের অফিস থেকে। ক্রীড়াঙ্গনে যা হাওয়া ভবন নামেই পরিচিত ছিল।

ক্রিকেট থেকে প্রায় শতকোটি টাকা লুটপাট হয়েছে বিএনপির শাসনামলে। আর এর সিংহভাগ তুলে নেয়া হয়েছে ক্রিকেটের মার্কেটিং স্বত্ব বিক্রি খাতে। ভারতীয় কোম্পানি নিম্বাসের হাতে বাংলাদেশের ক্রিকেটের আগামী পাঁচ বছরের মার্কেটিং স্বত্ব তুলে দেয়া হয়। অফিসিয়ালি প্রায় চারশ’ কোটি টাকার চুক্তি হয় বিসিবি ও নিম্বাসের মধ্যে। কিন’ নেপথ্যে এই অংকের পরিমাণ ছিল প্রায় পাঁচশ’ কোটি টাকা। একশ’ কোটি টাকা কোকো, লবী ও মাহবুব আনামরা ভাগাভাগি করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

নির্মাণ খাতে সবচেয়ে বড় দুর্নীতি হয়েছে মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়াম সংস্কার কাজে। টেন্ডার উন্মুক্ত হওয়ার আগেই কাজ শুরু করে জিবিবি। এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় বিস্তর লেখালেখি হলেও তা বন্ধ হয়নি। কেননা জিবিবির সঙ্গে জড়িত ছিলেন কোকোর কতিপয় সহযোগী।
চট্টগ্রাম বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পাওয়া থাই কোম্পানির সঙ্গে নেপথ্যে জড়িয়ে আছেন কোকো। ক্যাথে প্যাসিফিক (হংকং এয়ারলাইন্স), থাই এয়ারলাইন্সের জিএসএ (জেনারেল সেলস এজেন্ট) নেয়া হয়েছে এক্সপো লংকার নামে এবং ভার্জিনের জিএসএ এয়ারলাইন্স সার্ভিসেস লিমিটেডের ও কুয়েত এয়ারওয়েজের জিএসএ নেয়া হয়েছে উইংস টুরস এন্ড ট্রাভেলেসের নামে। প্রত্যেকটি কোম্পানির অন্যতম নেপথ্যে অংশীদার হলেন কোকো।

কোন রকম বিনিয়োগ ছাড়াই জোট সরকারের পাঁচ বছর শুধু বিটিভি থেকে প্রায় ১০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো। তার মূল ব্যবসা অ্যাডভান্স অ্যাডের সহযোগী প্রতিষ্ঠান অ্যাড মিডিয়ার মাধ্যমে এ টাকা হাতিয়ে নেন তিনি।
বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) সূত্র জানিয়েছে, জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিটিভির মূল্যবান সময় বা চাঙ্ক (পিক আওয়ার) যারা দখলে নেন তাদের মধ্যে আরাফাত রহমান কোকোর অ্যাড মিডিয়া অন্যতম। সপ্তাহের সোমবার রাত সাড়ে ৮টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত এক ঘণ্টার চাঙ্ক বরাদ্দ দেয়া হয় অ্যাড মিডিয়ার নামে। বিটিভির প্যাকেজ নীতিমালার আওতায় এভাবে আগে থেকে সময় বরাদ্দ দেয়ার নিয়ম না থাকলেও শুধু ওপর মহলের চাপে অ্যাড মিডিয়াকে চাঙ্ক বরাদ্দ দেয় বিটিভি। উল্লিখিত সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ধারাবাহিক নাটক কিনে তা বিটিভির কাছে বিক্রি করে অ্যাড মিডিয়া। বিনিময়ে তারা প্রতি ঘণ্টায় বিজ্ঞাপন প্রচার বাবদ সপ্তাহে এক লাখ টাকা করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে আয় করে। এভাবে প্রতিমাসে চার লাখ টাকা করে পাঁচ বছরে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা আয় করে অ্যাড মিডিয়া। এছাড়াও পহেলা বৈশাখ, ২১ ফেব্রুয়ারি (শহীদ দিবস), ১৬ ডিসেম্বর (বিজয় দিবস), ২৬ মার্চ (স্বাধীনতা দিবস), ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহাসহ বিশেষ দিনগুলোতে প্যাকেজ নাটক ও টেলিফিল্ম কিনে বিটিভির কাছে বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা আয় করে এ প্রতিষ্ঠান। শুধু নিজের অনুষ্ঠান নয় বিটিভির পিক আওয়ারে প্রচারিত আধ ঘণ্টার প্যাকেজ অনুষ্ঠানের সময় থেকেও অ্যাড মিডিয়ার নামে সংরক্ষণ করা হতো দুই থেকে তিন মিনিট। এ সময়ে নির্দিষ্ট হারে কমিশন নিয়ে বড় বড় কোম্পানির বিজ্ঞাপন প্রচার বাবদ পাঁচ বছরে কয়েক কোটি টাকা আয় করে অ্যাড মিডিয়া। অথচ কোকোর বিরুদ্ধে কেউ মুখ খোলার সাহস পাননি। Source:দৈনিক যুগান্তর
Date:2007-04-16

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: