মওদুদ গ্রেফতার

সাবেক আইনমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদকে গ্রেফতার করেছে যৌথ বাহিনী। ১১ ঘণ্টা বাসা ঘিরে রাখার পর যৌথ বাহিনী শুক্রবার সকালে তাকে বাসা থেকে গ্রেফতার করে। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম, কর ফাঁকি ও দলীয়করণসহ বহু অভিযোগ রয়েছে।

যৌথ বাহিনী বৃহস্পতিবার রাতভর তার বাসায় অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করেছে ত্রাণের ২২০ পিস শাড়ি, ১৬ বোতল বিদেশী মদ ও ৩২ ক্যান বিয়ার। এছাড়াও বেশকিছু কাগজপত্র ও ডকুমেন্ট জব্দ করেছে। গতকাল রাত ৮টা পর্যন্ত মওদুদ আহমদকে থানায় সোপর্দ করা হয়নি। যৌথ বাহিনীর হেফাজতে তাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জব্দ করা ত্রাণের শাড়ি, মদ ও বিয়ার যৌথ বাহিনী গুলশান থানায় জমা দিয়েছে। মদ উদ্ধারের ঘটনায় গুলশান থানার এসআই খবিরউদ্দিন বাদী হয়ে মাদকদ্রব্য আইনের ২৫(খ) ধারায় মামলা করেছেন। মামলা নম্বর-৪৪। গুলশান থানা পুলিশ জানায়, ত্রাণের শাড়ি ও মদ উদ্ধারের ঘটনায় মওদুদ আহমদকে আসামি করে আরেকটি মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।

মওদুদ আহমদের ব্যক্তিগত সহকারী শহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে মওদুদ আহমদ তার ছেলে আমান ও পুত্রবধূকে নিয়ে রাতের খাবার খেতে বাসার বাইরে যান। রাত ১০টার দিকে তিনি ছেলে ও পুত্রবধূকে নিয়ে বাসায় ফিরে আসেন। রাত সাড়ে ১০টার দিকে মওদুদ আহমদের পিএ শহিদুল ইসলাম ছুটি নিয়ে বাসায় চলে যান। এ সময় বাসায় মওদুদ আহমদ, তার ছেলে, পুত্রবধূ, বুয়া, ৩ কাজের ছেলে, গাড়িচালক মহিউদ্দিন এবং ৩ সিকিউরিটি গার্ড অবস’ান করছিলেন। মওদুদ আহমদের স্ত্রী হাসনা মওদুদ ও তার মেয়ে বর্তমানে লন্ডনে রয়েছেন।

মওদুদ আহমদের গাড়িচালক মহিউদ্দিন জানান, রাত পৌনে ১১টার দিকে দুটি গাড়িতে করে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা বাসার সামনে এসে নামেন। এ সময় তারা মওদুদ আহমদের ডুপ্লেক্স বাড়িটি ঘিরে ফেলে। এর মধ্যে ১ জনের সেনা, ২ জনের র‌্যাব এবং ২ জনের পুলিশের পোশাক পরা ছিল। বাকিরা ছিলেন সাদা পোশাকে। যৌথ বাহিনীর সদস্যরা সিকিউরিটি গার্ডকে ডেকে গেট খুলতে বলেন। এ সময় সিকিউরিটি গার্ড মাহফুজ মওদুদ আহমদের অনুমতি ছাড়া গেট খুলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। একপর্যায়ে মাহফুজ বাসার ভেতরে গিয়ে যৌথ বাহিনীর লোকজন আসার খবরটি ব্যারিস্টার মওদুদকে জানান। প্রায় ১৫ মিনিট পর মওদুদ আহমদ প্রধান গেটে এসে আগন’কদের পরিচয় জানতে চান। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর কি কারণে তারা এসেছেন সে ব্যাপারে তিনি জিজ্ঞেস করেন। এ সময় যৌথ বাহিনীর অভিযান পরিচালনাকারী এক কর্মকর্তা ব্যারিস্টার মওদুদকে জানান, তারা বাসা ‘সার্চ’ করবেন। ব্যারিস্টার মওদুদ এ সময় অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তার কাছে ‘সার্চ ওয়ারেন্ট’ আছে কিনা জানতে চান। যৌথ বাহিনীর কর্মকর্তা তাকে জানান, বাসার ভেতরে প্রবেশ করার পর তিনি এ ব্যাপারে কথা বলবেন। কিছুক্ষণ পর মওদুদ আহমদ সিকিউরিটি গার্ডকে গেট খুলতে বলে ভেতরে চলে যান। তিনি বেডর”মে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেন।

সূত্র জানায়, বাসায় প্রবেশ করার পর যৌথ বাহিনী মওদুদ আহমদের বেডর”মের সামনে গিয়ে দরজা খুলতে বলেন। মওদুদ আহমদ ভেতর থেকে আবারও ‘সার্চ ওয়ারেন্ট’ আছে কিনা জানতে চান। এ নিয়ে যৌথ বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে তার আবারও বাদানুবাদ হয়। যৌথ বাহিনীর সদস্যরা বাসার কাজের বুয়া, তিন কাজের ছেলে ও সিকিউরিটি গার্ডদের গেটে বসিয়ে রাখেন। রাত সাড়ে ১২টার দিকে যৌথ বাহিনী বাড়ির দোতলায় মওদুদ আহমদের ছেলের র”মসহ বিভিন্ন কক্ষে তল্লাশি চালায়। তারা সারারাত মওদুদ আহমদের বাড়িতে অবস’ান করে। শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে মওদুদ আহমদ তার র”মের দরজা খোলার পর যৌথ বাহিনী তার কক্ষে তল্লাশি চালিয়ে ১৬ বোতল বিদেশী মদ, ৩২ ক্যান বিয়ার ও বাথর”মের পাশের একটি তালাবদ্ধ কক্ষ থেকে বস-ায় রাখা ত্রাণের ২২০ পিস শাড়ি উদ্ধার করে। তল্লাশি শেষে সিজার লিস্ট করেন যৌথ বাহিনীর সদস্যরা। সকাল পৌনে ১০টার দিকে যৌথ বাহিনী মওদুদ আহমদকে আটক করে একটি ছোট জিপে তুলে নেয়। এ সময় মওদুদ আহমদের পরনে ছিল সাফারি স্যুট। জিপে ওঠার সময় তিনি বাসার গেটে দাঁড়ানো ব্যক্তিগত সহকারী শহিদুল ইসলামকে আইনগত সহায়তার জন্য ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের সহকর্মী ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন জানান, যৌথ বাহিনীর অভিযানের খবর শুনে তিনি রাত পৌনে ১২টার দিকে ওই বাসায় ছুটে যান। কিন’ তাকে ভেতরে ঢুকতে দেয়া হয়নি। রাত দেড়টা পর্যন- তিনি সেখানে অবস’ান করে বাসায় ফিরে যান। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আবার তিনি ব্যারিস্টার মওদুদের বাসায় যান। ব্যারিস্টার খোকন বলেন, কি কারণে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে তা পরিষ্কার নয়। সম্প্রতি এনবিআর ব্যারিস্টার মওদুদের ব্যাংক একাউন্ট জব্দ করে। এ ব্যাপারে তিনি হাইকোর্টে একটি রিট করেন। কয়েকদিন আগে হাইকোর্ট ওই রিটের রায় মওদুদের পক্ষে দেন। ব্যারিস্টার খোকনের মতে, এ কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে গ্রেফতার করা হতে পারে। বাসা থেকে মদ ও শাড়ি উদ্ধার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তার বাসায় প্রায়ই বিদেশী মেহমানরা আসেন। বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরাও পার্টিতে এসে থাকেন। তাদের আপ্যায়নের জন্য ওই মদ রাখা হয়ে থাকতে পারে। তাছাড়া ব্যারিস্টার মওদুদের ছেলে ব্রিটিশ নাগরিক। তিনিও তার প্রয়োজনে ওই মদ রাখতে পারেন। শাড়ি প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার খোকন বলেন, এগুলো ত্রাণের শাড়ি নয়।

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের আগে সাবেক জোট সরকারের মন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, তরিকুল ইসলাম, মির্জা আব্বাস, প্রতিমন্ত্রী মীর নাছির উদ্দিন, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, মোশাররফ হোসেন, আমানউল্লাহ আমান, সাবেক উপমন্ত্রী র”হুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, সাবেক সাংসদ মোসাদ্দেক আলী ফালু, আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া, নাসের রহমান, সালাহউদ্দিন আহমদ, মঞ্জুর”ল আহসান মুন্সী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হয়।

যৌথ বাহিনী সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠপুত্র তারেক রহমান, তার ব্যবসায়িক পার্টনার গিয়াসউদ্দিন আল মামুন, জামায়াতের সাবেক সাংসদ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ও গাজী নজর”ল ইসলামকে গ্রেফতার করেছে। এছাড়া গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে আরও রয়েছেন- আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ নাসিম, ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, ওবায়দুল কাদের, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, লোটাস কামাল, রফিকুল আনোয়ার, পংকজ দেবনাথ, চট্টগ্রামের মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী, সিলেটের মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরানসহ অনেক সাবেক সাংসদ ও নেতা।
Source:দৈনিক যুগান্তর
Date:2007-04-14

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: