সাংবাদিকদের রাতের ঘুম দিনের আরাম হারাম

জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিআইপি গেট। সামনেই সড়ক দ্বীপে ফুলের মনোরম বাগান। ছোট ছোট সবুজ ঘাস। মাথার নিচে হাত রেখে ঘাসের ওপর ঘুমন্ত একদল যুবক। তাদের কারও বুকের ওপর কারও পাশে রাখা ক্যামেরা, মাইক্রোফোন । অজস্র মশা ভন ভন করছে চারপাশে। এদের দেখে বিমানবন্দরে নিয়োজিত কর্মকর্তা -কর্মচারীদের বুঝতে অসুবিধা হয়নি, তারা সাংবাদিক। তবে অনেকেই মন্তব্য করেছেন, এ অবস্থায় সাংবাদিকদের আগে কখনও তারা দেখেননি। এ চিত্র সোমবার রাত ৩টার দিকের। এর আগেই রাত ৯টার দিকে ভিআইপি গেটে জড়ো হন পত্রিকা ও টেলিভিশনের প্রায় অর্ধশত সাংবাদিক। কেবল ভিআইপি গেটেই নয়, বিমানবন্দরের সবক’টি প্রবেশদ্বারে অবস্থান নেন রিপোর্টার ও ফটোসাংবাদিকরা। সব মিলিয়ে শতাধিক সাংবাদিকের বিনিদ্র রজনী কেটেছে বিমানবন্দর ঘিরে।

সোমবার রাতের ঘুম তো হারাম হয়েছে বটেই, মঙ্গলবারও তাদের দিনের আরাম হারাম হয়। এমনকি মিডিয়া অফিস থেকে এয়ারপোর্ট ডিউটির শিফট তৈরি করা হয়। সোমবার রাত ৯টা থেকে মঙ্গলবার রাত ৯টা পর্যন্ত টানা ২৪ ঘণ্টা বলতে গেলে আকাশপানে তাকিয়েই কেটেছে সাংবাদিকদের রাত-দিন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দেশত্যাগ করছেন এমন খবরের ভিত্তিতেই তথ্যপিপাসু সাংবাদিকদের ছোটাছুটি। বিভিন্ন মহল থেকে পত্রিকা অফিসে খবরটি আসার পর অন্যান্য কাজকর্ম শিথিল হয়ে পড়ে। ব্যস্ত হয়ে ওঠে মোবাইল ফোনগুলো। সরকারি কোন সূত্র খবরের সত্যতা স্বীকার না করায় সাংবাদিকদেরও উৎকণ্ঠা বাড়তে থাকে। রাত ৯টার দিকে পাল্টে যায় বিমানবন্দরের চিত্র। সাংবাদিকদের আনাগোনা দেখে বিমানবন্দরে নিয়োজিত ডজনখানেক গোয়েন্দা ও আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যদেরও দৌড়ঝাঁপের অন্ত ছিল না। খবর পেয়ে বাসা থেকে ছুটে আসেন বিমানবন্দরের একাধিক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা। নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়। বিভিন্ন সংস্থার লোকজন দর্শকবেশে সাংবাদিকদের খোঁজখবর নিতে আসেন।

কখন কোন এয়ারলাইন্সে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দেশত্যাগ করছেন তা জানার জন্য উন্মুখ ছিলেন সাংবাদিকরা। কখন কোন ফ্লাইট উড়ছে তার তালিকা সংগ্রহ করা হয়। কোন ফ্লাইটে কে যাচ্ছেন তাও তন্নতন্ন করে খোঁজা হয়। নানা গুজব। তবুও প্রতিটি গুজবকেই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে যাচাই-বাছাই করা হয়। একটু পরপরই খবরের ধরন বদলাতে থাকে। একবার শোনা যায়, খালেদা জিয়া একাই দেশত্যাগ করছেন। আবার শোনা যায়, সঙ্গে থাকছেন তার ছোট ছেলে কোকো। এখনই খালেদা জিয়া দেশত্যাগে রাজি হলেন। একটু পরই আবার শোনা যায়, আজ নয়, কাল খালেদা জিয়া দেশত্যাগ করবেন। বিব্রতকর নানা তথ্য। এরই মাঝে বারবার মোবাইল ফোন বাজতে থাকে।

অফিসের বার্তা কক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয় সর্বশেষ অবস্থা। আসলে এ অবস্থার শেষ কোথায় তা সারারাতেও নিশ্চিত হতে পারেননি সাংবাদিকরা। এমনকি পরদিনও না। বাসায় চলে যাওয়ার পরও অনেক দায়িত্বশীল সাংবাদিক গভীর রাতে ফিরে আসেন অফিসে। একদিকে যেমন বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের বিনিদ্র রাত কেটেছে কাল, অন্যদিকে অফিসগুলোও জেগে ছিল সারারাত।

সাংবাদিকদের ভিড় দেখে ঘাবড়ে যান মাঝরাতে বিমানবন্দরের স্বজনদের বিদায় জানাতে আসা লোকজনও। বিমানবন্দরে কোন গাড়ি প্রবেশ করলেই ফটোসাংবাদিকরা দৌড়ে যান সেদিকে। এ পরিস্থিতি এমন যে, অনেকেই ভুলে গিয়েছিলেন তাদের রাতের খাবারের কথা। শেষ রাতের দিকে বিমানবন্দরের সড়কের পাশে টং দোকানের ভাজি-পরাটা, চা-বিস্কুট খেতে খেতে রহস্য করে অনেকেই বলেছেন, মনে হচ্ছে আমরা সেহরি খাচ্ছি।

রাত ৪টা অবদি খবরের সত্যতা না পাওয়ায় একপর্যায়ে সাংবাদিকরাই পরিণত হয়ে যান সংবাদের বিষয়বস্ত। কেউ রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে, কেউ ফুটপাতের ওপর বসে, কেউ ঘাসের ওপর শুয়ে আছেন। এরই মাঝে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের সহকর্মীরা মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে এগিয়ে আসেন। সহকর্মীর কাছে জানতে চান, ঘটনা ও এর প্রতিক্রিয়া। মঙ্গলবার পর্যন্ত খালেদা জিয়ার দেশত্যাগের ‘গুজবটি’ গুজবই ছিল। কখন তা বাস্তবে পরিণত হয় সে প্রতীক্ষায় সাংবাদিকদের এখন সতর্ক দৃষ্টি জিয়া বিমানবন্দরের দিকে। Source:দৈনিক যুগান্তর
Date:2007-04-18

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: