সংকটে আওয়ামী লীগ

শেখ হাসিনার দেশে প্রত্যাবর্তন সম্পূর্ণ অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় বড় ধরনের সংকটের মুখোমুখি হয়েছে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের পুরো রাজনীতি, কার্যক্রম ও দিকনির্দেশনা দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার হাতে। দলের ওপর তার কঠোর নিয়ন্ত্রণ। জরুরি অবস্থার কারণে রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকলেও দলের নেতাকর্মীদের মনোবল অটুটু রাখতে দেশে শেখ হাসিনার উপস্থিতি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দলীয় সভানেত্রীর দেশে প্রত্যাবর্তনের পথে সৃষ্ট পাহাড়প্রমাণ বাধায় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছেন। শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির ব্যাপারে তারা কোন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেননি। অনেকের মধ্যে রয়েছে গ্রেফতার আতংক। নেতৃত্বের ওপর সারিতে দোদুল্যমানতা দলের মাঠ পর্যায়ে হতাশা ছড়িয়ে তুলছে।

ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জিল্লুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল চুপচাপ। তারা দু’জনই অসুস্থ। বুধবার শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ওপর সরকারি প্রেসনোট জারি হওয়ার সময় কন্যা ডা. শরমীনা জলিল জেসির বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে নওগাঁয় ছিলেন। ওই দুই নেতা দলের নেতাকর্মীদের কোন দিকনির্দেশনাও দিতে পারছেন না। সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করার উদ্যোগও নেই। কর্মী-সমর্থকরা অন্ধকারে। জরুরি অবস্থা ও নিষিদ্ধ ঘরোয়া রাজনীতির মুখে ওয়ার্কিং কমিটি বা প্রেসিডিয়াম বৈঠক বসবে না। দলের প্রথম ও দ্বিতীয় সারির নেতাদের সঙ্গে দেশে থাকতে শেখ হাসিনার যে দূরত্ব ছিল, তার অনুপস্থিতিতে তা আরও বেড়েছে। প্রভাবশালী প্রেসিডিয়াম সদস্য আমির হোসেন আমু অসুস্থ স্ত্রীর শয্যাপাশে এখন সিঙ্গাপুরে। আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সময় পার হচ্ছে দেশের পরিস্থিতির ওপর নজর রেখে। তাদের ব্যাপারে শেখ হাসিনা সন্দিহান। জানা যায়, দেশে ফিরতে দেয়া না হলে প্রতিবাদ কর্মসূচির ঘোষণার বার্তা দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। নেতারা আমলে নেননি। তবে কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকেই মনে করেন, ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন আর দলের নেতাকর্মীদের কারাগারে রেখে শেখ হাসিনার বিদেশ যাওয়া ঠিক হয়নি। দলের একাধিক সূত্র জানায়, শেখ হাসিনা দেশের বাইরে গেলে আর ফিরতে পারবেন না এমনটি তিনিও জানতেন। আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের নেতারাও তাকে বিদেশ না যেতে অনুরোধ করেছিলেন। সিনিয়র নেতারা মনে করেন, দেশের বাইরে থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সম্পর্কে কঠোর মন্তব্য করা সঠিক হয়নি। এতে দূরদর্শিতার কোন প্রমাণ ছিল না। তার অতিকথন তার জন্যই নয়, দলের জন্যও বিপদ ডেকে এনেছে বলে অনেক নেতা মনে করেন।

সূত্র জানায়, দলের মাঠ নেতারা ও সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দিচ্ছেন। প্রেসিডিয়াম সদস্য আমির হোসেন আমু, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ নানা ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতর আন্দোলন-সংগ্রাম ও জেল-জুলুম সয়ে দলের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। শেখ হাসিনার সঙ্গে তাদের দূরত্ব দিনে দিনে এতটাই বেড়েছে যে, দলের অভ্যন্তরে পরিবর্তিত পরিস্থিতি নিয়ে তাদের ঘিরে অনেক কথাবার্তা চলছে। সন্দেহ, অবিশ্বাস বেড়েই চলেছে। দলের অভ্যন্তরে জোরেশোরে কথাবার্তা চলছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুই নেত্রীকে দেশের বাইরে রেখে রাজনৈতিক সংস্কারের উদ্যোগ নিলে আওয়ামী লীগে আমু-তোফায়েলরাই হবেন দলের কাণ্ডারি। ’৮১ সালে দলীয় কাউন্সিলে আওয়ামী লীগ যখন বড় ধরনের ভাঙনের মুখে তখন নেতাকর্মীদের আবেগ-অনুভূতি রক্ষা করে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে শেখ হাসিনা দলের সভানেত্রীর দায়িত্ব নেন। পরবর্তী সময়ে আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে এক দফা ও ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে আরেক দফা দলীয় ভাঙন দেখা দিলে দলীয় গণতন্ত্র নির্বাসনে যায়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন গুঞ্জনও আছে সংস্কারের মাধ্যমে আওয়ামী লীগে ড. কামাল হোসেনকেও ফিরিয়ে আনা হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে যা চাপা ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়েছে বর্তমান বাস্তবতায় তা ঘনীভূত হতে পারে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করছেন। শুধু ওপর সারির নেতৃবৃন্দ নয়, মধ্যম পর্যায়ের অনেক নেতাই দলকে নতুন করে পুনর্গঠনের পক্ষে। তাদের মতে, বর্তমান বাস্তবতা ও দলের মধ্যে গতিশীলতা আনার লক্ষ্যে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। Source:দৈনিক যুগান্তর
Date:2007-04-21

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: