বাদামতলী থেকে শ্যামবাজার বুড়িগঙ্গা নদী গ্রাস করছে সরকারি সংস্থা

পুরনো ঢাকার বাদামতলী থেকে শ্যামবাজার পর্যনত্দ বুড়িগঙ্গা নদী ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে সারি সারি মার্কেট। যাদের ওপর দায়িত্ব এই নদী রৰণাবেৰণের, সরকারি সেই প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ অভ্যনত্দরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষই (বিআইডাবলিউটিএ) গড়ে তুলেছে এ মার্কেটগুলো। নদী ভরাট করে মার্কেট তৈরি করলেও এগুলোর নাম দিয়েছে ‘ট্রানজিট শেড।’ পরিবেশ আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী ভরাট করে এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণ শাসত্দিযোগ্য অপরাধ। আর বিআইডাবলিউটিএ জানিয়েছে, বৈধ বাণিজ্য প্রমোট করতে তারা এ কাজ করেছে। এমনকি আরো দেড়শ’ মার্কেট গড়ার পরিকল্পনা তাদের রয়েছে।

বৃটিশ আমলে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে বাকল্যান্ড বাধ নির্মাণ করা হয়েছিল। যে বাধে নাগরিকরা বৈকালিক ভ্রমণে বের হতেন। এরশাদের আমলে বাকল্যান্ড বাধের সীমানায় নির্মাণ করা হয় বন্যা নিয়ন্ত্রণ দেয়াল। বিআইডাবলিউটিএর মার্কেটগুলো নির্মাণ করা হয়েছে সেই দেয়ালের দৰিণ দিকে নদী ভরাট করে। বাদামতলী থেকে শুরম্ন হয়েছে এ মার্কেট। সেখানে নির্মাণ করা হয়েছে তিনটি স্থাপনা। এসব মার্কেটে রয়েছে হামীম ফ্রুটস এজেন্সি, দেশবাংলা এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স মোলস্না এন্টারপ্রাইজ, মীম এন্টারপ্রাইজসহ বিভিন্ন ফলের দোকান।

বাদামতলী থেকে আরেকটু পূর্বে ওয়াইজঘাটে দেখা যায় আরো তিনটি মার্কেট। এ মার্কেটগুলোয় ফলের দোকান ছাড়াও আছে ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি, ওয়ার্কশপ, ভাঙারি ও কাপড়ের দোকান। লালকুঠি এলাকায় আছে তিনটি মার্কেট। এগুলোতে আছে কাপড়ের বিক্রয় কেন্দ্র, পিয়াজ, রসুন এবং কাঠালসহ দেশীয় ফলের ব্যবসা। শ্যামবাজারে আছে চারটি মার্কেট। এর মধ্যে তিনটি মার্কেটে রয়েছে পান সুপারির ব্যবসা এবং অন্য একটি মার্কেট হয়ে উঠেছে ফলের আড়ত।

উলেস্নখিত সব মার্কেটের প্রকৃতি প্রায় এক। দেয়ালগুলো পাকা এবং উপরে টিনের ছাদ। তবে দোকান সংখ্যায় রয়েছে পার্থক্য। যেমন শ্যামবাজারের দুটি মার্কেটের দোকানের সংখ্যা যথাক্রমে ২১ ও ২৩। আবার কোথাও দোকানের সংখ্যা ছয়-সাতটি।

বিআইডাবলিউটিএ তাদের তৈরি এসব মার্কেটকে নাম দিয়েছে ট্রানজিট শেড। তবে শুধু একটি মার্কেটের নাম অন্যরকম-‘বিআইডাবলিউটিএ মার্কেট’। এ মার্কেটটির অবস্থান সদরঘাট লঞ্চঘাটের পূর্ব দিকে। সেখানে হোটেল, টেলিফোন, সেলুন, ফাস্ট ফুড, স্টেশনারিসহ বিভিন্ন ধরনের প্রায় অর্ধশত দোকান রয়েছে। এ মার্কেটের পুরোটাই পাকা। মার্কেটের সামনে একটু খালি জায়গাও রাখা হয়েছে।

বাকল্যান্ড বাধ সংলগ্ন পুরনো ঢাকার ঐতিহ্যবাহী নবযুগ শরীর চর্চা কেন্দ্রের বিপরীতে গড়ে উঠেছে বিআইডাবলিউটিএ মার্কেট।

কেন্দ্রের প্রবীণ শরীর চর্চাবিদ ও নয়াবাজারের বাসিন্দা হাজী মোঃ জাহাঙ্গীর এখানে শরীর চর্চা করে আসছেন ৪২ বছর ধরে। তিনি বলেন, আগে এখানে এসে শরীর চর্চাকারীরা খোলা ও স্বাস্থ্যকর হাওয়ায় ব্যায়াম করতো, কুসত্দি লড়তো। এখন বাধের ওপর নদীর ধারে দোকান-মার্কেট ওঠে নদীর বাতাস আসা বন্ধ হয়েছে। ভিড় জমে নির্মল পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেছে।

নবযুগের আরেক শরীর চর্চাকারী শিরিষ দাস লেনের বাসিন্দা অ্যাডভোকেট শংকর দত্ত এখানে শরীর চর্চা করছেন ২০ বছর ধরে। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, নদীর ওপর দোকান ও মার্কেট করায় বাতাস ঠিকমতো আসে না। মানুষও সহজে চলাচল করতে পারে না। নবযুগ শরীর চর্চা কেন্দ্রের সবাই নদীর ওপর নির্মাণ করা মার্কেট ভেঙে ফেলার দাবি জানান।

সরেজমিন গিয়ে আরো দেখা যায়, মার্কেট নির্মাণ করেই শেষ হয়নি নদী ভরাট প্রক্রিয়া। বরং এখনো তা অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন মার্কেটের পেছনে মাটি, আবর্জনা, কংকৃট ফেলে ভরাট করা হচ্ছে নদী। শ্যামবাজারে একটি মাকর্েেটর পেছনে মাটি ফেলে আরো প্রায় ১৫ হাত জায়গা ভরাট করা হয়েছে। বাদামতলীতে একটি মার্কেটের পেছনে কলার কাদি, নারিকেলের খোসা ইত্যাদি ফেলে ভরাট করা হয়েছে আরো প্রায় ১০ হাত জায়গা।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সভাপতি ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ প্রফেসর মোজাফফর আহমদ এ প্রসঙ্গে বলেন, বিগত খালেদা জিয়া সরকারের আমলে নদী বিষয়ক একটি টাস্ক ফোর্স গঠন করা হয়েছিল। টাস্ক ফোর্সের রিপোর্টে বলা হয়েছিল, নদীর তীরে গাছপালা থাকবে, কোনো ধরনের স্থাপনা থাকতে পারবে না। নদীর তীরকে গড়ে তোলা হবে মানুষের রিকৃয়েশনের কেন্দ্র হিসেবে। বুড়িগঙ্গা নদী ভরাট করে এ মার্কেটগুলো নির্মাণ টাস্ক ফোর্সের রিপোর্টের পরিপন্থী। তিনি অবিলম্বে নদীর ওপর তৈরি করা বিআইডাবলিউটিএর মার্কেটগুলো ভেঙে ফেলার দাবি জানিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তা না হলে অন্যের স্থাপনা তারা ভাঙছে কেন?

নদী আইন বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের শিৰক ড. আসিফ নজরম্নল এ প্রসঙ্গে বলেন, নদী ভরাট করা শাসত্দিযোগ্য অপরাধ। ব্যক্তি কিংবা সরকারি প্রতিষ্ঠান সবার জন্যই এ আইন সমভাবে প্রযোজ্য।

পরিবেশ বাচাও আন্দোলনের নির্বাহী পরিচালক আবু নাসের খান এ প্রসঙ্গে বলেন, আইনে যদি বৈধতাও দেয়া হয়, এরপরও পরিবেশবাদীর দৃষ্টিকোণ থেকে এটি অবৈধ। নদীর তীরে বড়জোর গাছপালা থাকতে পারে। তিনি অবিলম্বে সব মার্কেট ভেঙে ফেলার দাবি জানান।

নদী বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাতের সঙ্গে এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, নদীতে স্থাপনা নির্মাণ করে প্রশসত্দতা কমিয়ে দেয়া হলে নদী মরে যেতে থাকে। তিনি আরো বলেন, রিভার ফ্রন্ট খোলা থাকা উচিত, যাতে মানুষ রিকৃয়েশন সেন্টার হিসেবে নদীর তীর ব্যবহার করতে পারে।

এ ব্যাপারে বিআইডাবলিউটিএর চেয়ারম্যানের দফতরে যোগাযোগ করা হলে সচিবের সঙ্গে কথা বলতে পরামর্শ দেয়া হয়। সচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে পরিচালকের (বন্দর ও পরিবহন) সঙ্গে কথা বলতে বলা হয়। পরিচালক (বন্দর ও পরিবহণ) মোতাহার হোসেন জানান, তারা বাদামতলী, শ্যামবাজার, পাগলা, ফতুলস্না প্রভৃতি এলাকায় আরো দেড়শ ট্রানজিট শেড নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। নদী ভরাট করে ট্রানজিট শেড বা মার্কেট নির্মাণের আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, অনেক দিন থেকেই সেখানে বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা গড়ে উঠেছিল। বিভিন্ন সময়ে সেগুলো উচ্ছেদও করা হয়। এ নিয়ে মামলাও হয়েছিল। তিনি আরো জানান, নদীর তীরভূমিতে গড়ে ওঠা স্থাপনা থেকে ভাড়া আদায় করা হতো। তবে কে ভাড়া পাবে এ নিয়ে সিটি কর্পরেশন, সেনাবাহিনী ও বিআইডাবলিউটিএর মধ্যে বিরোধ ছিল। পরে বৈধ বাণিজ্যকে প্রমোট করতে বিআইডাবলিউটিএ এসব ট্রানজিট শেড নির্মাণ করে।

সূত্রঃ http://www.jaijaidin.com/details.php?nid=6852

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: