দুই নেত্রীকে নিয়ে বিপাকে সরকার

দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের দুই নেত্রীকে নিয়ে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিপাকে পড়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর এ ধরনের কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি তারা আর কখনো হয়নি। এতে করে জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হওয়া ছাড়াও আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। পরিস্থিতির প্রতি তারা সার্বক্ষণিক নজর রাখছেন। এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টির আগে যে প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতা দেখানোর প্রয়োজন ছিল, সরকারের কর্মকান্ডে তার প্রতিফলন ঘটেনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ১১ জানুয়ারি সারাদেশে জরুরি অবস্থা জারির পর দুর্নীতি উচ্ছেদকে প্রধান এজেন্ডা করে সরকার অভিযানে নামে। এ অভিযান শুরুর দিকে জনগণের ব্যাপক সমর্থন লাভ করে। কিন্তু ক্রমে এ অভিযানের সাথে রাজনৈতিক এজেন্ডা জড়িয়ে পড়ায় নতুন করে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। এখন সব অভিযান নিয়ে হ-য-ব-র-ল অবস্থা তৈরি হয়েছে। দুর্নীতির রাজনৈতিক চ্যাপ্টার উচ্ছেদের সময় বেশ কিছুসংখ্যক রাজনীতিবিদের নামে গরু চুরি, গাছ চুরি, ত্রাণের শাড়ি ও এক বান্ডিল টিন আত্মসাতের ঘটনায় মামলা হয়েছে। এসব মামলায় সরকারের গ্রহণযোগ্যতাই শুধু নয়, নিরপেক্ষতা ও দুর্নীতি দমনে সরকারের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা নিয়েও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে এবং আইনি দুর্বলতাগুলোও প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে। এক দিকে সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব পোষণ করছে, অন্য দিকে রাষ্ট্রীয় ব্যাঙ্ক থেকে নেয়া ঋণের শতকোটি টাকার সুদ মওকুফ এবং শীর্ষ ঋণখেলাপিদের ব্যাপারে নমনীয়তা প্রদর্শন করছে- যা দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে সরকারের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নের সমমুখীন করেছে।

সূত্র জানিয়েছে, দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের দুই প্রধানের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর মনোভাব ভবিষ্যৎ নির্বাচন নিয়ে সরকারের সদিচ্ছাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সাধারণ মানুষ মনে করছে, দুই নেত্রীর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তা তাদের অপরাধের চেয়ে রাজনীতি থেকে নির্বাসনে পাঠানোর একটি প্রক্রিয়া মাত্র। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার আনার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল। জনগণও বিষয়টি সেভাবেই দেখছিল। কিন্তু এখন দেশের প্রধান দুটি দলের জনপ্রিয় দুই শীর্ষ নেতাকে এভাবে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখার প্রচেষ্টা নিয়ে জনমনে সন্দেহ ও সংশয় তৈরি হয়েছে। বলা হচ্ছে, দেশে আইনের শাসন বহাল আছে। কিন্তু দুই নেত্রীকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার প্রচেষ্টা কোনোভাবেই যুক্তিগ্রাহ্য হচ্ছে না। জনগণ মনে করছে, এটি সরকারের এজেন্ডা হওয়া উচিত নয়। এই পদক্ষেপ সরকারের ভালো পদক্ষেপগুলোকেও প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, কেউ রাজনীতি শুরু করা কিংবা এর থেকে দূরে থাকা এটি একান্ত তার নিজের ব্যাপার। দেশে যখন নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু হবে তখন জনগণই ঠিক করে নেবে রাজনীতিতে তারা কাকে বরণ করবেন। এ নিয়ে জবরদস্তির কোনো সুযোগ নেই। নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এটি এজেন্ডা হওয়া উচিত নয়। রাজনীতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা সরকারের এজেন্ডা নয়। এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসও স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় রাজনীতি শুরু করার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। আবার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়ই তিনি আপাতত দূরে সরে গেছেন। কিন্তু এখন দেশে-বিদেশে ব্যাপক প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে দুই নেত্রীকে নিয়ে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ। একটি বড় দলের নেত্রীকে ঘোষণা দিয়ে দেশের বাইরে রাখা হচ্ছে। আরেকজনকে জোর করে দেশের বাইরে পাঠানোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু সরকার বিষয়টি নিয়ে আসলে কী হচ্ছে তাও সপষ্ট করে বলছে না। ফলে এ নিয়ে জনমনে নানা সন্দেহ সংশয় দানা বেঁধে উঠছে।
সূত্র জানিয়েছে, সরকারের কাজকর্মে সমন্বয়হীনতা, অপরিপক্বতা ও ঘন ঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের বিষয় ফুটে উঠছে। আবার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী যা হওয়ার কথা সেটিও হচ্ছে না। ব্যাপক প্রচারণা রয়েছে, বর্তমান সরকার প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলো থেকে লোক সরিয়ে ভিন্ন প্লাটফর্ম দাঁড় করাতে চাইছে। এতে করে এক ধরনের ধোঁয়াটে অবস্থা তৈরি হয়েছে। শুরুতে সরকার যে ধরনের নিরপেক্ষতা প্রদর্শন করেছিল বর্তমানে সেখানেও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এখন কারো কারো নামে মামলা হচ্ছে, গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হচ্ছে আবার তা স্থগিতের ঘটনাও ঘটছে। কাউকে ধরা হচ্ছে আবার গভীর রাতে ছেড়েও দেয়া হচ্ছে। এ সবই সরকারের কাজে সমন্বয়হীনতা ও পরিকল্পনার অভাবকে প্রকটভাবে তুলে ধরছে।

এর মাঝে উপদেষ্টাদের কথাবার্তাও অনেক ক্ষেত্রে যুক্তিহীন ও অতিকথননির্ভর বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, এর আগেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক’জন উপদেষ্টা কথাবার্তায় ছিলেন বেশি অগ্রসর। তাদের অতিকথনের ফলেই এক পর্যায়ে সরকার একেবারেই অকার্যকর হয়ে পড়ে। কথাবার্তায় তারা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেননি। সরকারের আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে গতিশীলতা আনতে ব্যর্থ হওয়া। ব্যবসায়ীরা এতে ক্ষুব্ধ। একজন ব্যবসায়ীকে ৫ লাখ টাকা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তর করতে হলে এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিতে হচ্ছে। এই বিষয়টি অর্থনীতির স্বাভাবিক প্রবাহকে ব্যাহত করছে।

এ দিকে দুই নেত্রীর ওপর চাপ সৃষ্টির প্রচেষ্টা দেশে-বিদেশে সরকারের ভাবমর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের যে উদার গণতান্ত্রিক ইমেজ ছিল তা নিয়ে এখন নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। খোদ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং বাংলাদেশের বনধুপ্রতিম মুসলিম দেশগুলোতেও এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সরকার গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বেগম খালেদা জিয়াকে সৌদি আরবে পাঠানোর চেষ্টা চালাচ্ছিল বলে ব্যাপক প্রচারণার মুখে জানা গেছে সরকার ওই প্রচেষ্টা থেকে সরে এসেছে। অবশেষে মধ্যপ্রাচ্যের তিন-চারটি মুসলিম দেশেও ভিসা সংগ্রহের চেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু সেখান থেকেও ভিসা দেয়া হবে না বলে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। এখন সেসব চিন্তা বাদ দিয়ে মালয়েশিয়ায় তার ভিসা সংগ্রহের চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে জানা গেছে। Source:দৈনিক নয়া দিগন্ত
Date:2007-04-25

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: