বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে ভারতীয় পত্রপত্রিকার মূল্যায়ন

বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকার সম্পর্ক ভারতের মনোভাব খুব দ্রুত পরিবর্তিত হতে শুরু করেছে। ঢাকায় বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করার পর যেভাবে দুর্নীতি উচ্ছেদ, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি এবং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ প্রভৃতি কার্যক্রম হাতে নিয়েছিল- তা ভারতের গণমাধ্যম এবং পররাষ্ট্র দফতরের কর্মকর্তাদের দ্বারা প্রশংসিত হয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার সম্পর্ক নয়াদিল্লির ইতিবাচক মনোভাবের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল, এই সরকার সপষ্ট সঙ্কেত দিয়েছিল বাংলাদেশের মাটিতে ভারতবিরোধী কোনো তৎপরতা বরদাশত করা হবে না। এ ছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ভারতের সাথে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতার নতুন পদক্ষেপ গ্রহণে আগ্রহী বলেও জানিয়ে দিয়েছিল।
কিন্তু গত ক’দিন ধরে যেভাবে বাংলাদেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের নেত্রীদ্বয়কে দেশের বাইরে রাখার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে তাতে এই সরকারের ভাবমর্যাদা ভারতে ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে।
বিশেষ করে, শেখ হাসিনাকে যেভাবে তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে বাধা দেয়া হয়েছে, ভারতে তার ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
ঢাকার রাজনৈতিক ঘটনাবলি নিয়ে প্রথম উদ্বেগ প্রকাশ করে ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’। ১৬ এপ্রিল ওই পত্রিকায় প্রকাশিত ‘দি আনসেটেলিং অব বাংলাদেশ’ বা ‘অনিশ্চয়তার কবলে বাংলাদেশ’ প্রতিবেদনে লন্ডনের কিংস কলেজের অধ্যাপক হর্ষ ভি পন্থ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘মুসলিম দুনিয়ায় বাংলাদেশ কিছু দিন আগেও অপেক্ষাকৃত সুস্থির গণতন্ত্র বলে পরিচিত ছিল। বর্তমানে এই দেশটি জরুরি অবস্থার শাসনে রয়েছে।
সংসদের নির্বাচন অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশটিতে সামরিক বাহিনী রাজনৈতিক ব্যবস্থার শুদ্ধিকরণের নামে দেশের রাজনীতিতে আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে চাইছে। এই ধরনের পরিস্থিতি ইসলামি চরমপন্থীদের উত্থানেই সাহায্য করবে।’
টাইমস অব ইন্ডিয়া তাদের প্রথম পাতায় ২৩ এপ্রিল ‘বাংলাদেশে শূন্যতায় ভারত উদ্বিগ্ন’ শীর্ষক এক খবরে বলেছে, ‘‘যেভাবে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনাকে জবরদস্তি করে দেশের বাইরে পাঠানোর চেষ্টা করছে তাতে ১২ জানুয়ারির ‘নরম ক্যু’ (ঝড়ভঃ ঈড়ঁঢ়) এখন বিপজ্জনকভাবে গুরুতর হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের রাজনীতিকে পরিশুদ্ধ করার বিষয়ে ভারতের কোনো আপত্তি ছিল না। কিন্তু ঢাকার বর্তমান পরিস্থিতি রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি করছে।”
টাইমস অব ইন্ডিয়ার এই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী বাংলাদেশের রাজনীতিকে পরিশুদ্ধ করার প্রচেষ্টা শুরু হয় গত বছর গ্রামীণ ব্যাংকের প্রধান ড. মুহামমদ ইউনূসের এক বক্তব্য অনুযায়ী। এর মোদ্দা কথা ছিল, রাজনীতিকে দুর্নীতিপরায়ণ নেতাদের হাত থেকে মুক্ত করতে হবে, নতুনভাবে ভোটার তালিকা রচনা করতে হবে, অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন ঘটাতে হবে এবং পরাষ্ট্রনীতি নতুন ছাঁচে ঝালাই করতে হবে। ইউনূস বলেছিলেন, দুই দলেরই উচিত শ্রদ্ধাভাজন এমন কোনো এক ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা যিনি এই সমস্যাগুলো সমাধানে গ্রহণযোগ্য এক প্যাকেজ নিয়ে সামনে আসতে পারবেন।
২৪ এপ্রিল আনন্দবাজার পত্রিকা ‘স্থিতিশীলতা কোথায়’ শীর্ষক এক সম্পাদকীয়তে বলেছে, ‘বাংলাদেশে তদারকি সরকারের কার্যকলাপ ক্রমেই নানা প্রশ্ন ও সংশয়কে উস্কাইয়া তুলিতেছে।
কোথায় যেন পাকিস্তানের চিত্রনাট্যটির সহিত বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলির সাদৃশ্য পাওয়া যাইতেছে।… তদারকি সরকারের একাধিক কাজে গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতি বিশ্বস্ততা লক্ষ্য করা যাইতেছে না। পাকিস্তানের বিবর্তনের নজির স্মরণে রাখিলে তাহা ভারতের পূর্ব সীমান্তে এক অশনি সংকেত বলিয়া প্রতিভাত হইতে পারে।’
২৪ এপ্রিল সংসদ প্রতিদিন পত্রিকা ‘ফিরতে বাধা হাসিনার’ শীর্ষক এক সম্পাদকীয়তে বলেছে, ‘বাংলাদেশের সরকার ও রাজনৈতিক নেত্রীদের চাপান-উতোরের ফলে ওখানকার পরিস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই জটিল হয়ে উঠছে। সৃষ্টি হচ্ছে মানুষের ক্ষোভ-বিক্ষোভেরও।’
২৪ এপ্রিল দৈনিক স্টেটসম্যান পত্রিকা ‘হাসিনাকে বাধা’ শীর্ষক এক সম্পাদকীয়তে বলেছে, “পশ্চিমের দাতাগোষ্ঠীরা ইতিমধ্যে এই ঘটনাটি সম্বনেধ তাদের বিরূপ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে। হাসিনার প্রতি এই সহানুভূতি প্রকাশ করে তারা বেশ কিছু প্রশ্ন রেখেছে যা সামরিক কর্মকর্তাদের নিশ্চিত বিব্রত করবে এবং তাদের ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রয়াসকে জোর ধাক্কা দেবে। সঙ্গে সঙ্গে হাসিনার দ্রুত নির্বাচন সম্পন্ন করার দাবিকে জোরালো সমর্থন জোগাবে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর তো ইতিমধ্যেই নির্বাচন নিয়ে সামরিক কর্মকর্তাদের দীর্ঘসূত্রীতা সম্বনেধ ‘অসন্তোষ ও হতাশা’ প্রকাশ করেছে। দেড় বা দু-বছর পর নির্বাচন অনুষ্ঠান মার্কিনীদের কাছে কোনও মতেই গ্রহণযোগ্য নয়। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন ছাড়া বাংলাদেশের যে আবার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াতে ফিরে যাবার কোনও সুযোগ নেই এই সাধারণ সত্যটা তদারকি সরকারে সামরিক কর্তারা জেনেও না জানার ভান করছেন। দেশ ও জাতির স্বার্থে নির্বাচন নিয়ে কালক্ষেপণ করা যে এক সর্বনাশা খেলা, এই সতর্কবার্তাও তারা গায়ে মাখছেন না। ফলে বাংলাদেশ আর এক প্রস্থ অস্থিরতা ও চরম বিশৃঙ্খলার দিকে এগোচ্ছে। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের যথেষ্ট চিন্তিত হওয়ারই কথা।”
এদিকে বুধবার ভারতের কিছু পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, শেখ হাসিনা লন্ডনে সাংবাদিকদের কাছে বলেছেন, বেগম জিয়াকে দেশ থেকে বের করে দেয়ার পদক্ষেপকে তিনি সমর্থন করেন না। কেউ কোনো অপরাধ করলে দেশেই তার বিচার হওয়া উচিত। পরসপরের শত্রু বলে কথিত দুই নেত্রী তাদের সঙ্কটের সময় কাছাকাছি এসে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের জন্ম দেবেন কি না এই সম্ভাবনা ভারতের পররাষ্ট্রবিষয়ক বিশেষজ্ঞদেরও নতুন এক ভাবনায় ফেলেছে। Source:দৈনিক নয়া দিগন্ত
Date:2007-04-26

বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে ভারতীয় পত্রপত্রিকার মূল্যায়ন-এ একটি মন্তব্য হয়েছে

  1. Spiderman বলেছেন:

    সুযোগ নেই এই সাধারণ সত্যটা তদারকি সরকারে সামরিক কর্তারা জেনেও না জানার ভান করছেন। দেশ ও জাতির স্বার্থে নির্বাচন নিয়ে কালক্ষেপণ করা যে এক সর্বনাশা খেলা, এই সতর্কবার্তাও তারা গায়ে

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: