সরকারের সাথে দুই নেত্রীর সমঝোতা

গঠনমূলক সংস্কার কার্যক্রমের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরুর ব্যাপারে দুই প্রধান রাজনৈতিক দল এবং সরকারের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এ ব্যাপারে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি ও সমমনা দলগুলো এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ও সমমনা দলগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সংস্কার কার্যক্রম মেনে নিয়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু করার ক্ষেত্রে সহায়তা দেবে। অন্যদিকে সরকার আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে আসার পথে বাধা দেবে না। আর বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে বিদেশে যাওয়ার ব্যাপারে চাপ দেয়া হবে না। দুই প্রধান রাজনৈতিক পক্ষই নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শুরুর ব্যাপারে সরকারকে সহযোগিতা করবে। একই সাথে নির্বাচন শেষে কার্যকর গণতান্ত্রিক শাসন শুরুর পর বর্তমান অন্তর্বর্তী সময়ে গৃহীত কার্যক্রমে বৈধতা দিয়ে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার শূন্যতা দূর করা হবে। গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারিকৃত দুটি প্রেসনোটের সাথে এর যোগসূত্র রয়েছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, রাজনৈতিক পক্ষগুলোর সাথে সরকারের এ সমঝোতা উদ্যোগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারকদের কারো কারো বিশেষ উদ্যোগ রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার দেশের কূটনীতিকদের কারো কারো এ উদ্যোগে পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে জানা গেছে। উপদেষ্টা পরিষদের একাধিক আনুষ্ঠানিক- অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে এ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে সরকারের মধ্যে কয়েক দিন আগ থেকেই ভিন্ন চিন্তা শুরু হয়। শেখ হাসিনার দেশে ফিরতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তাকে রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক ব্যক্তি ঘোষণা এবং বেগম খালেদা জিয়াকে দেশ ত্যাগের জন্য চাপ প্রয়োগের প্রচেষ্টা নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার মুখে সরকার তার পূর্ব অবস্থান থেকে সরে আসার বিষয় সক্রিয়ভাবে ভাবতে শুরু করে। আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় এ ঘটনা ব্যাপক কভারেজ পাওয়ায় এবং বিশ্বের বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ নিয়ে সোচ্চার হওয়ার পর সরকার তার অবস্থান পরিবর্তন করেছে। বাংলাদেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও এখন তাদের দুই নেত্রীকে নিয়ে সোচ্চার। দেশের জনমতও দ্রুত এ ইস্যুতে পরিবর্তন হচ্ছে।

জানা গেছে, সরকারের কর্মকাণ্ডে অসপষ্টতা ও সমন্বয়হীনতা থাকায় এবং রাজনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে নতুন বিতর্কে জড়িয়ে পড়ায় এখন সরকার আর আগের মতো এ নিয়ে এগোতে চাইছে না।
সূত্র জানিয়েছে, সরকারের চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযান এবং আগামী দিনের রাজনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি একই সমান্তরালে চলে আসায় বিতর্ক দেখা দেয়। জরুরি অবস্থার কারণে দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতা বন্ধ থাকায় এ নিয়ে প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলছে না। এটিকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে সরকার চেয়েছিল দুই নেত্রীকে দেশের বাইরে স্থানান্তর করতে। কিন্তু এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বেঁকে বসে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। তারা সরকারকে সাবধান করে দিয়ে বলেছে, অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাজ এটি নয়। তারা একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার করে দিয়ে জনগণকে তাদের ভোটের মাধ্যমে পছন্দনীয় সরকার কায়েমের পথ করে দেবে। জনগণ কাকে নির্বাচিত করবে আর কাকে করবে না সেটি তারাই নির্ধারণ করে নেবে। জনগণের কাজ জনগণকেই করতে দেয়া উচিত বলে তারা মনে করছে। এর বাইরে কোনো দায়িত্ব সরকারের থাকা উচিত নয়।

জানা গেছে, উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশে একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দেখতে চায়। এ জন্য কাউকে দেশে ফিরতে বাধা দেয়া বা কাউকে দেশ ত্যাগে বাধ্য করাকে তারা মানবাধিকারের পরিপন্থী বলে মনে করছে।
সূত্র জানিয়েছে, শেখ হাসিনা বিদেশে গিয়েছিলেন সরকারের গ্রিন সিগন্যাল পেয়ে। তিনি যথারীতি ফিরে আসবেন এবং তাকে বাধা দেয়া হবে না- এ নিশ্চয়তাও তাকে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। এর পর শেখ হাসিনা লন্ডনে অবস্থান করে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে মনোনিবেশ করেন। তিনি বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা নিয়ে বক্তব্য রাখেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনার সাথে এ নিয়ে যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। দুই নেত্রীকে দেশের বাইরে রাখার বিষয়ে কেউই একমত হতে পারছে না। শেখ হাসিনা বলেছেন, তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে এবং তিনি কোনো অপরাধ করলে তার বিচার দেশেই হতে পারে। দেশেই তিনি সব অভিযোগ মোকাবেলা করবেন। বেগম খালেদা জিয়াও একই মনোভাব পোষণ করেন। প্রায় অন্তরীণ অবস্থায় তিনি বিভিন্ন মারফতে যে বক্তব্য রেখেছেন, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছে। এ ছাড়া দুই নেত্রীকে বিদেশে রাখার ব্যাপারে বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের আইনি অবস্থানও নতুন প্রেক্ষাপট তৈরিতে সাহায্য করেছে। বর্তমান সরকার নিজেদের একটি সাংবিধানিক সরকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করায় সংবিধানকে সম্পূর্ণভাবে পাস কাটানো তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোও এ পরিস্থিতিতে উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। বিশেষ করে বেগম খালেদা জিয়াকে দেশ ত্যাগে বাধ্য করার খবরে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে। সরকার দফায় দফায় সৌদি আরবের ভিসা সংগ্রহের জন্য চেষ্টা চালিয়েও সফল হয়নি। একই সাথে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, কুয়েতসহ কয়েকটি মুসলিম দেশেও তাকে পাঠানোর চেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়। অবশেষে চেষ্টা চালানো হয় মালয়েশিয়ার ভিসা সংগ্রহের জন্য। কিন্তু সেখান থেকেও আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়নি। এ অবস্থাটি সরকারের ভাবমর্যাদাকেও বিদেশের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এবং সরকারের মধ্যেও এ নিয়ে দ্বিধাবিভক্তি ফুটে উঠেছে।

গতকাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র মিসআর সিন ম্যাককরম্যাক বলেছেন, বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সতর্ক পদক্ষেপ না নিলে দেশের ভবিষ্যৎ গণতন্ত্র বিপন্ন হতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেটা চায় না। আমেরিকা বাংলাদেশে যথাসম্ভব দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে সেটিই প্রত্যাশা করে। বাংলাদেশে নিযুক্ত কূটনীতিকরাও বর্তমান অবস্থায় রাজনীতিবিদদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছে। সবকিছু মিলিয়েই সরকার তার পূর্ব অবস্থান থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে। Source:দৈনিক নয়া দিগন্ত
Date:2007-04-26

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: