মান্নান ভুঁইয়াকে খালেদার তিরস্কার

মহাসচিব পদ রক্ষায় নানামুখী তৎপরতা চালিয়েও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ম্যানেজ করতে পারছেন না আবদুল মান্নান ভুঁইয়া। মান্নান ভুঁইয়াসহ দুঃসময়ে রহস্যজনক ভূমিকা পালনকারী কজন দলীয় নেতার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে খালেদা জিয়া অনড়। ওমরাহ করতে সৌদি আরব যাওয়ার আগেই বহিষ্কার অথবা পদচ্যুত করে মহাসচিব পদে নতুন কাউকে দায়িত্ব দিতে পারেন তিনি। তবে রহস্যজনক ভূমিকা পালনকারী নেতাদের ‘সাইজ’ করতে বিএনপির মেয়াদোত্তীর্ণ বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে দেওয়ার ব্যাপারেও খালেদা জিয়ার ওপর দলের একটি অংশের চাপ রয়েছে বলে বিএনপি সূত্র জানায়।

এমতাবস্থায় মান্নান ভুঁইয়া আবারো খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যাপারে বিভিন্ন মহলের মাধ্যমে তৎপরতা শুরু করেন। পরে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য সাক্ষাতের অনুমতি পেলে তিনি গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টায় ক্যান্টনমেন্টের বাসায় খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাড়ে ৭টায় বেরিয়ে আসেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সাক্ষাৎকালে খালেদা জিয়া দুঃসময়ে রহস্যজনক ভূমিকার কারণে মান্নান ভুঁইয়াকে তিরস্কার করেছেন এবং তার প্রতি চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। মান্নান ভুঁইয়া তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেও খালেদা জিয়া উত্তেজিত হয়ে তাকে ভবিষ্যৎ পরিণতির জন্য অপেক্ষা করতে বলেন।

জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে রহস্যজনক ভূমিকা পালন করায় সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এমন খবর শুনে গত মঙ্গলবার রাত থেকেই দলের চেয়ারপারসনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার চেষ্টা শুরু করেন বিএনপি মহাসচিব আবদুল মান্নান ভুঁইয়া। এ কারণে মঙ্গলবার রাতেই তিনি একটি বিবৃতিতে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দলের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। এই বিবৃতির মাধ্যমে তিনি চেয়ারপারসনের মন জয়ের চেষ্টা করেন বলে বিএনপি নেতারা মনে করছেন। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে আবারো চেষ্টা চালান তিনি। এর অংশ হিসেবে প্রথম দফায় তিনি তার অনুসারী ও দলের যুগ্ম মহাসচিব সেলিমা রহমান ও সাবেক সাংসদ সুলতানা আহমেদকে খালেদা জিয়ার ক্যান্টনমেন্টের বাসায় পাঠান। দ্বিতীয় দফায় পাঠান দলের সহ দপ্তর সম্পাদক এমরান সালেহ প্রিন্স ও ঢাকা মহানগর কমিটির নেতা হাবিবুল ইসলাম ববিকে। কিন’ তারা কেউই মান্নান ভুঁইয়ার সাক্ষাৎ করার ব্যাপারে খালেদা জিয়াকে রাজি করাতে পারেননি। পরবর্তী সময়ে রাতে ছোটভাই সাঈদ এস্কান্দরের বাসায় যাচ্ছেন শুনে মান্নান ভুঁইয়া আবারো খালেদা জিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কোনো গ্রিন সিগন্যাল না পেয়ে এবার যুগ্ম মহাসচিব গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে সাঈদ এস্কান্দরের বারিধারা পার্ক রোডের বাসায় পাঠান। কিন’ গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ও মান্নান ভুঁইয়াকে কোনো সুসংবাদ দিতে পারেননি। তাই মান্নান ভুঁইয়া চেয়ারপারসনের সঙ্গে সাক্ষাতে ব্যর্থ হন। এ পরিস্থিতিতে তিনি ৩টি সংবাদ সংস্থার সঙ্গে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় চেয়ারপারসনের প্রশংসা করেন এবং ঘরোয়া রাজনীতি শুর” হলে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বেই দলের সংস্কার হবে বলে উল্লেখ করেন। সেই সঙ্গে দলে কোনো বিভেদ নেই বলে উল্লেখ করে মান্নান ভুঁইয়া বলেন, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বেই দলীয় নেতারা ঐক্যবদ্ধ। এ প্রতিক্রিয়াও তিনি খালেদা জিয়াকে সন’ষ্ট করার জন্যই দিয়েছেন বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন। তবে অনেকেরই ধারণা এ প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
বিষয়টি আঁচ করেই মান্নান ভুঁইয়া তার ঘনিষ্ঠজনদের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের সর্বাত্মক চেষ্টা চালান। একটি মহল তাকে গতকাল দুপুরের আগেই সাক্ষাতের সুযোগ হবে বলে আশ্বাস দিলে তিনি ক্যান্টনমেন্টে মঈনুল রোডের বাসায় যাওয়ার জন্য প্রস’তিও নেন। কিন’ পরে তাকে জানানো হয় বিকাল ৫টায় যেতে। ৫টার অনেক আগেই মান্নান ভুঁইয়ার সঙ্গে খালেদা জিয়ার বাসায় যেতে বিএনপির দপ্তর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তি ও সহদপ্তর সম্পাদক এমরান সালেহ প্রিন্স তার গুলশানের বাসায় আসেন। এক পর্যায়ে যুগ্ম মহাসচিব নজরুল ইসলাম খানও আসেন। মান্নান ভুঁইয়াও প্রস’তি নেন। কিন’ গুলশান থেকে রওনা দেওয়ার আগেই মান্নান ভুঁইয়াকে জানানো হয় তার সঙ্গে খালেদা জিয়া দেখা করতে চান না।

শেষমেশ গতকাল সন্ধ্যা ৭টায় ক্যান্টনমেন্টের বাসায় গিয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ হলেও বের হয়ে আসার সময় মান্নান ভুঁইয়াকে বিষণ্ন দেখা গেছে। মান্নান ভুঁইয়া এ অবস্থা হবে আগে থেকে আঁচ করতে পেরেই সঙ্গে কাউকে নেননি। একাই গিয়েছেন চেয়ারপারসনের মনোভাব বুঝতে। তবে আসার সময় চেয়ারপারসন যে দায়িত্ব দেবেন তা তিনি মেনে নেবেন বলে মান্নান ভুঁইয়া জানিয়ে এসেছেন। খালেদা জিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ এক বিএনপি নেতার বরাত দিয়ে অপর এক দলীয় নেতা জানান, সাক্ষাতের সুযোগ দিলেও মান্নান ভুঁইয়াকে ক্ষমা করবেন না তিনি। আপোষহীন নেত্রী সঠিক সময়েই সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন।

খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে মান্নান ভুঁইয়া তার গুলশানের বাসায় এসে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের জানান, চেয়ারপারসনের সঙ্গে কুশল বিনিময় হয়েছে। উনি সারা দেশের নেতাকর্মীরা কেমন আছে জানতে চেয়েছেন। আমি যতোটুকু জানি তা বলেছি। তার দুঃসময়ে দেশবাসী তার জন্য দোয়া করেছেন এ জন্য তিনি তাদের অভিনন্দন জানিয়েছেন ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

এদিকে চেয়ারপারসনের কুনজরে থাকা ঢাকা মহানগর বিএনপির সভাপতি সাদেক হোসেন খোকাসহ আরো কজন দলীয় নেতা মান্নান ভুঁইয়ার দিকে তাকিয়ে আছেন। মান্নান ভুঁইয়া পরিস্থিতি সামাল দিতে পারলে তারাও রক্ষা পাবেন এ আশায়ই বসে আছেন। এ জন্য তারা টাইম টু টাইম মান্নান ভুঁইয়ার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। এমনকি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হান্নান শাহর সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন তারা। উল্লেখ্য, গত ৭ মার্চ তারেক রহমান গ্রেপ্তার ও ৮ মার্চ ঘরোয়া রাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়ার পর থেকেই মান্নান ভুঁইয়াসহ বিএনপির বেশ কজন প্রভাবশালী নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। খালেদা জিয়া অসুস্থ হওয়ার পরও তারা কেউ দেখতে যাননি তাকে।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও দলের মুখপাত্র নজরুল ইসলাম খান বলেন, দলে কাউকে ইন বা আউট করার ব্যাপারে গঠনতান্ত্রিকভাবেই চেয়ারপারসনকে সর্বময় ক্ষমতা দেওয়া আছে। তিনি ভালো মনে করলে কাউকে রাখতে পারেন আবার খারাপ মনে করলে বাদও দিতে পারেন। বিএনপির সহসভাপতি এম কে আনোয়ার বলেন, কাউকে বাদ দেওয়ার ব্যাপারে চেয়ারপারসন আমাদের সঙ্গে আলোচনা করেননি। তবে বাদ দেওয়ার এখতিয়ার তার আছে। Source:ভোরের কাগজ
Date:2007-04-28

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: