অনিময় ও দুর্নীতিতে ডুবতে বসেছে ডেসকো

অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচার ও স্বজনপ্রীতির কারণে বিদু্যৎ বিভাগের সবচেয়ে লাভজনক এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা বিদু্যৎ বিতরণ কোম্পানি (ডেসকো) ডুবতে বসেছে । জনবল নিয়োগ, পদোন্নতি, গাড়ি ব্যবহারে অনিয়ম ও অবৈধ বিদু্যৎ ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে কোন ধরনের ব্যবস্থা না নেয়ায় গত ১০ বছরে এই প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম শুধু বেড়েই চলছে।
শেয়ারবাজারে ডেসকোর শেয়ার ছাড়া নিয়েও ঘটেছে নানা কেলেংকারির ঘটনা। গত পাঁচ বছরে নিয়োগ দেয়া হয়েছে প্রায় ৫শ’ কর্মকর্তা-কর্মচারী। ডেসকোর নীতিমালা লঙ্ঘন করে ঊধর্্বতন কর্মকর্তাদের পরিবারের লোকজন ও নিকটাত্দীয়দের বেশ কয়েকটি বড় ধরনের পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। জাল কাগজপত্র জমা দিয়ে অনেকে নিয়োগ পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ৩৩ কেভি ক্যাবল ক্রয়, নিশান ডাবল কেবিনেট পিকআপ, টয়োটা ব্র্যান্ড নিউ কার ক্রয় ও অসংখ্য পুরনো গাড়ি মেরামতের নামে বিপুল পরিমাণ টাকা লুটপাট হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীর তদবিরে ওরিয়েন্টাল ব্যাংকে ডেসকোর ১২ কোটি টাকার ফিক্সড ডিপোজিট করা নিয়েও নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে ওই টাকা জব্দ অবস্থায় রয়েছে। ওয়াকিটকি ক্রয়ের ক্ষেত্রেও বোর্ডের কোন অনুমোদন নেয়া হয়নি। গুলশানে ডেসকোর নিজস্ব ভবন নির্মাণের জন্য জমি ক্রয়ে অনিয়ম হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ৬ কোটি টাকার জমির দাম ১১ কোটি টাকা দেখিয়ে ক্রয় করা হয়। এছাড়া নতুন লাইন (এইচটি/এলটি) নির্মাণ, নতুন সাবস্টেশন ট্রান্সফরমার বসানো, পুরনো ট্রান্সফরমার প্রতিস্থাপন, সাবস্টেশন বিল্ডিংয়ের কাজ ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে মোটা অংকের টাকা লোপাট হয়েছে। জানা গেছে, ডেসকোর বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এসব অনিয়ম-দুনর্ীতির সঙ্গে জড়িত। অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
ডেসকোর এসব অনিয়ম-দুনর্ীতির তদন- শুরু করছে দুনর্ীতিবিরোধী টাস্কফোর্স। ইতিমধ্যে টাস্কফোর্স ডেসকোর শেয়ার ছাড়া এবং লোক নিয়োগ সংক্রান- যাবতীয় কাগজপত্র ও ফাইলের ফটোকপি জব্দ করেছে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সালেহ আহম্মদ বলেছেন, টাস্কফোর্স শুধু শেয়ারের কাগজপত্র জব্দ করেছে। অন্য কোন অভিযোগের তদন- করছে না টাস্কফোর্স।
অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ বিদু্যৎ সংযোগ নেয়ার দায়ে গুলশান এক নম্বর এলাকার একটি বিলাসবহুল শপিং কমপ্লেক্স, কামাল আতাতুর্ক এভিনিউর একটি ভবনের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি কতর্ৃপক্ষ। বরং শাস-ি ও বিল কমিয়ে দুনর্ীতির মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া মিরপুর এলাকার পূরবী সিনেমা হল ও সংলগ্ন দুটি মার্কেটের বিরুদ্ধে ৭২ লাখ টাকা জরিমানা করার কথা থাকলেও তাদের কাছ থেকে মাত্র ১১ লাখ টাকা নিয়ে সংযোগ চালু করা হয়। একইভাবে মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের সুজাতনগর হারুন মোল্লা মার্কেটে ২২ লাখ টাকা পেনাল বিল করা হলেও চক্রটি বিল কমিয়ে আবার সংযোগ প্রদান করে মোটা অংকের টাকার রাজস্ব থেকে সরকারকে বঞ্চিত করে। ২০০৪ সালে ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালেহ আহম্মেদ একটি অফিস আদেশ জারি করে কল্যাণপুর খাজা সুপার মার্কেটের ১৫ লাখ টাকা এবং পূরবী বিল্ডার্সের ৭৫ লাখ টাকা মওকুফ করে দেন। এছাড়া অনেক এলাকায় ডিপোজিট ওয়ার্কের পরিবর্তে উন্নয়ন কাজ দেখিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে অবৈধভাবে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, মিরপুর মাজার রোড বুদ্ধিজীবী কবরস্থান সংলগ্ন একটি প্রতিষ্ঠানের নতুন লাইন নির্মাণ করে ডিপোজিট ওয়ার্কের পরিবর্তে ডেভেলপমেন্ট ওয়ার্কের আওতায় অবৈধ ক্ষমতা প্রয়োগ করে সরকারকে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত করেছে চক্রটি। গত ৫ বছরে শুধু এই প্রক্রিয়ায় চক্রটি গুলশান, মিরপুর, বারিধারা, ক্যান্টমেন্ট, উত্তরা, দক্ষিণখান এলাকার গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রায় ৪০ কোটি টাকা সরকারের রাজস্ব ক্ষতি করে নিজেরা প্রায় ২০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
১৯৯৪ সালে ডেসকো ২৪০ জনবল নিয়ে যাত্রা শুরু করে। জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই জনবল এক লাফে ৩ গুণ বেড়ে যায়। এসব নিয়োগের ঘটনায় হয়েছে বড় ধরনের কেলেংকারি। লোক নিয়োগে গত ৫ বছর ডেসকোতে নানা অনিয়ম হয়েছে। অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অবস্থায় অনিয়ম-দুনর্ীতির অভিযোগে শাস-িমূলকভাবে পদাবনতি হওয়া একজনকে উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) পদে নিয়োগ দেয়া হয়। শুধু তাই নয়, তাকে স্থানীয়ভাবে কেনাকাটার জন্য লোকাল টেন্ডার কমিটির আহ্বায়ক করা হয়। উপ-মহাব্যবস্থাপক পদে অপর একজনের নিয়োগও অনিয়মতান্ত্রিকভাবে দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাকে প্রথমে তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) উপদেষ্টা হিসেবে অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হয়। পরে ব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক) পদে লোক নিয়োগের সময় তিনিও প্রাথর্ী হন। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে এই পদে বয়সসীমা সর্বোচ্চ ৪৮ চাওয়া হলেও তার বয়স ছিল ৫২ বছর। তা সত্ত্বেও তাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ভায়রা পরিচয় দিয়ে উত্তর বিওবিতে কর্মরত একজন ব্যবস্থাপকও ডেসকোতে চাকরি করছেন। অপর এক ঘনিষ্ঠ আত্দীয় ১৯৯৯ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করলেও এখন অনেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে নিয়োগ পান। আইটি সেকশনে একজন সহকারী প্রোগ্রামারকেও নিয়োগ দেয়া হয়েছিল, যিনি ওই শীর্ষ কর্মকর্তার আপন ভাতিজা। বারিধারা বিওবির একজন ডিজিএমের ঘনিষ্ঠ লোক হওয়ায় কমার্শিয়াল সার্ভিস সেকশনের একজন অফিসার রাতারাতি সহকারী ব্যবস্থাপক থেকে উপ-ব্যবস্থাপক এবং পরে ব্যবস্থাপক হিসেবে প্রমোশন লাভ করেন। এছাড়া একসময় ডেসকোতে আবেদন করে নির্বাচিত হতে পারেননি এমন একজন কর্মকর্তা পরবর্তী সময়ে ডেসকোতে নিয়োগ পান। নিয়োগ পাওয়ার পরপরই তিনি পদোন্নতি পান। অভিযোগ রয়েছে, পল্লী বিদু্যৎ সমিতির সাবেক তিন উপ-মহাব্যবস্থাপক ডেসকোর এক শীর্ষ কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠ হওয়ায় ডেসকোতে নিয়োগ পান। এছাড়া জোন এফ-এর একজন সুপারভাইজার নিয়োগ দেয়া হয়েছে, যিনি মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত। কিন\’ এই পদে নিয়োগ পাওয়ার জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা চাওয়া হয়েছিল ডিপ্লোমা ইন ইলেট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং। এছাড়া প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা চাওয়া হলেও প্রায় ৯৬ জন এসওএস (সাবস্টেশন) অফিসার নিয়োগ দেয়া হয়েছে, যাদের অনেকের প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ছিল না।
মিরপুর এলাকার অসংখ্যা গ্রাহক অভিযোগ করেছেন, মিটার ভালো থাকার পর ডেসকোর মিটার রিডাররা অনেকটা জোরপূর্বক তাদের মিটার কিনতে বাধ্য করেছে। জানা গেছে, ২০০২ সালে ডেসকো এলাকার ১ লাখ গ্রাহকের মধ্যে ৯৮ হাজার গ্রাহককে নতুন মিটার কিনতে বাধ্য করা হয়েছিল। ত্রুটিপূর্ণ মিটারের কথা বলে এই মিটার কিনতে বাধ্য করা হয় বলে অনেক গ্রাহক অভিযোগ করেন।
এসব অভিযোগ সম্পর্কে ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সালেহ আহম্মদের কাছে জানতে চাইলে তিনি কয়েকটি অভিযোগ সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেন। বাকি অভিযোগের কোন ভিত্তি নেই এবং বেশিরভাগ মিথ্যা ও মনগড়া বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ডেসকোর সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে একটি মহল তার পেছনে লেগেছে। ডেসকোর পুরনো কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি দুনর্ীতিবাজ চক্রের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা ডেসকোকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল। ঘুষ-দুনর্ীতির কারণে এদের অনেকের চাকরি চলে গেছে। অনেকে ওএসডি হয়েছে। এখন তারা ঘরে-বাইরে ষড়যন্ত্র করছে। কিন\’ তার সময়ে ডেসকোর সিস্টেমলস ৪৬ শতাংশ থেকে কমে ১৩ শতাংশ হয়েছে। এর আগে ডেসকো কখনও লাভের মুখ দেখেনি। তিনি আসার পর ডেসকো লাভের মুখ দেখেছে। গত বছর ডেসকো লাভ করেছে ৫৪ কোটি টাকা। এ বছর তা ৯০ কোটি টাকা হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুনর্ীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এগুলো সম্পূর্ণ বানোয়াট, মনগড়া ও ভিত্তিহীন অভিযোগ। তিনি বলেন, নিয়োগ নিয়ে কোন অনিয়ম হয়নি। ডেসকোতে তার কোন আত্দীয় নেই। তবে এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভালো এবং যোগ্য লোক যদি আত্দীয় হয় তাতে ক্ষতি কি? বিলের টাকা কমিয়ে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি প্রসঙ্গে বলেন, এ ধরনের কোন নজির নেই ডেসকোতে। কারও বিল কমিয়ে দেয়া হয়নি। তবে কোন কোন গ্রাহকের জরিমানা কমিয়ে তাকে বিল দিতে উৎসাহিত করা হয়েছে। ডেসকোর শেয়ার সম্পর্কে তিনি বলেন, টাস্কফোর্স বিষয়টি তদন- করছে। ওই সংক্রান- কিছু ফাইলের কপি তারা নিয়েছে।

সূত্রঃ http://jugantor.com/online/news.php?id=61899&sys=1

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: