এরশাদের চারটি দুর্নীতি মামলা পুনরুজ্জীবিত

সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নিম্ন আদালতে বিচারাধীন চারটি দুর্নীতি মামলা পুনরুজ্জীবিত করে বিচার কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। মামলা চারটি হচ্ছে- ইএনজি (ইলেকট্রনিক নিউজ গ্যাদারিং) ইউনিট ক্রয়ে দুর্নীতি মামলা, রাডার ক্রয়ে দুর্নীতি, ৮৯ উপজেলায় ডিজিটাল ল্যান্ডফোন স্থাপনে দুর্নীতি ও শিল্পব্যাংক থেকে ঋণ মঞ্জুরিতে অনিয়ম সংক্রান্ত দুর্নীতি মামলা।

এছাড়াও এরশাদের বহুল আলোচিত স্বর্ণ চোরাচালান সংক্রান্ত দুর্নীতির মামলা রয়েছে রায়ের পর্যায়ে। জেনারেল মঞ্জুর হত্যা মামলারও বিচার কাজ শেষ পর্যায়ে। এর বাইরে দুর্নীতি দমন কমিশনের হাতে তদন্তাধীন রয়েছে দুটি মামলা। অন্যদিকে বিগত জোট সরকারের শেষ সময়ে এরশাদকে যে তিনটি মামলায় অব্যাহতি দেয়া হয়েছিল, সে মামলাগুলোর নিষ্পত্তি যথার্থ হয়েছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে আইনজীবীরা বলেছেন, নিষ্পত্তি হওয়া মামলা পুনরুজ্জীবিত করা যায় না।

দেশে জরুরি অবস্থা জারির পর অন্যান্য দলের কার্যক্রমের সঙ্গে জাতীয় পার্টির কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়। দেশের দুই শীর্ষ নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে নিয়ে যখন আলোচনার ঝড় বইছে ঠিক সেই মুহূর্তে এরশাদের বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে। তিনি রাজনীতি করবেন নাকি অবসরে যাবেন কিংবা তিনি দেশের বাইরে চলে যাবেন কিনা তা নিয়ে যখন বিভিন্ন মহলে জল্পনা-কল্পনা চলছে, সে সময় এরশাদের বিরুদ্ধে একযোগে চারটি মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হওয়ায় এরশাদের বিষয়টি নতুন করে সামনে চলে এসেছে। তার বিরুদ্ধে বিচারাধীন স্বর্ণ চোরাচালান মামলার রায় পঞ্চম দফায় পেছানো হয়েছে। আগামী ১২ মে এ মামলার রায়ের জন্য পুনরায় দিন ধার্য করা হয়েছে। কি কারণে মামলাটির রায় বারবার পেছাচ্ছে তারও কোন সদুত্তর নেই রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের কাছে।

ঢাকার বিভাগীয় বিশেষ জজ মালিক আবদুল্লাহ আল আমিনের আদালতে বর্তমানে বিলুপ্ত দুর্নীতি দমন ব্যুরোর দায়ের করা এরশাদের চারটি দুর্নীতি মামলার বিচার কার্যক্রম চলছে। আগামী ২৩ মে জেনারেল মঞ্জুর হত্যা মামলার সাক্ষ্য শুনানি হবে। ইতিমধ্যে এ মামলার বাদী নিহত জেনারেল আবুল মঞ্জুরের ভাই ব্যারিস্টার আবুল মনসুরসহ ১১ জন সাক্ষী আদালতে হাজির হয়ে সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। সূত্র জানায়, মামলাটি শেষ করার জন্য এর তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির এএসপি আবদুল কাহ্‌হার আকন্দকে আদালতে হাজির হয়ে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য আগামী ধার্য তারিখে নোটিশ জারি করা হতে পারে।

এরশাদের বিরুদ্ধে ইএনজি ক্রয়ে দুর্নীতি মামলার সাক্ষী জাতীয় সম্প্রচার কর্তৃপক্ষের তৎকালীন চেয়ারম্যান সাইফুল বারী ও তৎকালীন চিফ ইঞ্জিনিয়ার নওশের আলী রোববার ঢাকার বিভাগীয় আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তারা বলেছেন, ১৯৮৮-এর বন্যার পর তদানীন-ন সরকারের ইচ্ছায় সচিবালয়ের নির্দেশে তারা ঢাকায় দুটি ইএনজি ইউনিট স্থাপন করেন। আর এর উদ্দেশ্য ছিল দেশ-বিদেশে বন্যার খবরাখবর সম্প্রচার করা। চার্জশিটে বলা হয়েছে, ’৮৮-এর বন্যার পর হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও তার পত্নী রওশন এরশাদের কার্যক্রম দেশ-বিদেশে সম্প্রচারের জন্য দুটি ইএনজি ইউনিট (মিনি টিভি সেন্টার) স্থাপনের কাজে সরকারের ২ কোটি ৯৮ লাখ টাকা অপচয় করা হয়েছে। দু’জন সাক্ষী জবানবন্দি প্রদানের পর তাদের জেরা করেন এরশাদের প্রধান আইনজীবী শেখ সিরাজুল ইসলাম। জেরা শুনানিতে আইনজীবী জানান, সাবেক রাষ্ট্রপতি যে দুটি ইএনজি ইউনিট স্থাপন করেছেন বিটিভি কর্তৃপক্ষ এখনও সেই ক্যামেরা ব্যবহার করছে। এ সময় এরশাদ আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তবে তিনি এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া বিষয়ে কোন কথা বলেননি। ১৯৯২ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতি দমন ব্যুরোর এসিও আলী হায়দার বাদী হয়ে তেজগাঁও থানায় ইএনজি ক্রয়ে দুর্নীতি মামলাটি দায়ের করেন। আগামী ৩০ মে এ মামলার পরবর্তী সাক্ষ্য শুনানির দিন ধার্য করেছেন আদালত।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে তিনটি রাডার ক্রয় সংক্রান্ত দুর্নীতি মামলাটি হয়েছে ১৯৯২ সালের মে মাসে। এ মামলায় সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদকে প্রধান আসামি করে ১৯৯৪ সালের ২৭ অক্টোবর দুর্নীতি দমন ব্যুরো মোট ৫ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে। চার্জশিটে আসামি করা হয় তৎকালীন বিমান বাহিনী প্রধান সুলতান মাহমুদ, সহকারী বিমান বাহিনী প্রধান আতিকুর রহমান, রাডার ক্রয়ের জন্য টেন্ডারে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড ট্রেডার্স লিমিটেডের পরিচালক শাহজাদ আলী ও একেএম মুসা। মামলায় এরশাদসহ অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়, ফ্রান্স যে মূল্যে বাংলাদেশকে রাডার দিতে চেয়েছিল তার চেয়ে দ্বিগুণ মূল্যে অর্থাৎ ৪০ লাখ ৯১ হাজার ২শ’ মার্কিন ডলারে মার্কিন কোম্পানির কাছ থেকে রাডার ক্রয় করা হয়। এতে রাষ্ট্রের ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয়। এ মামলাটি বিচারের জন্য সচল করে সাক্ষীদের প্রতি সমন জারি করা হয়েছে। আগামী ৩০ মে পুনরায় মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছে।

এরশাদ ও তার সরকারের টিএন্ডটি মন্ত্রী কাজী ফিরোজ রশিদসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে ৮৯টি উপজেলায় ডিজিটাল ল্যান্ডফোন স্থাপনে দুর্নীতির মামলাটি হয়েছিল ১৯৯২ সালের সেপ্টেম্বরে। এ মামলায় অন্য আসামিরা হলেন- টিএন্ডটি বোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যান কাজী মাসুদ আলী, জিএম আনোয়ারুল কাদের, ডিজিএম শামসুল ইসলাম ও টেন্ডারে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স একপ্রো ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের এমডি আবদুল মজিদ চৌধুরী। পরে তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিটও দেয়া হয়। তবে আদালতে চার্জ গঠন শুনানির সময় ২০০৩ সালের ৭ মে এই মামলা থেকে অব্যাহতি পান কাজী ফিরোজ রশিদ।
মেসার্স থ্রি স্টার নামে একটি পোল্ট্রি ফার্মকে শিল্প ব্যাংকের ৩৫ লাখ টাকা অবৈধভাবে মওকুফ করার ঘটনায় এরশাদ ও শিল্প ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান একেএম মোশাররফ হোসেনসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলাটি হয়েছিল ১৯৯১ সালের ১১ এপ্রিল। মামলার চার্জশিট হয় ওই বছর ৬ নভেম্বর। মামলায় অন্য আসামিরা হলেন- থ্রি স্টারের পরিচালক ফিরোজ করিব, ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহাঙ্গীর কবির ও পরিচালক বোরহানউদ্দীন। মামলার বিচার শুরুর খবর জানার পর ফিরোজ কবির ও জাহাঙ্গীর কবির রোববার বিচারিক আদালতে আ্তসমর্পণ করেছেন। তবে নোটিশ পাওয়ার পর আদালতে আ্তসমর্পণ না করায় শিল্প ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও জোট সরকারের জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এজেএম মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। এ মামলায় তিনি একজন পলাতক আসামি। আগামী ৩০ মে’র মধ্যে তাকে আদালতে হাজির হতে বলা হয়েছে।
এদিকে এরশাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলাগুলো হয়রানির দলিল হিসেবে উল্লেখ করে তার আইনজীবী শেখ সিরাজুল ইসলাম বলেছেন, বিগত (১৯৯১-১৯৯৬) বিএনপি সরকার সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে হয়রানি করার জন্য একের পর এক দুর্নীতির মামলা দিয়েছিল। তার মতে, সাজানো এসব মামলায় সাবেক রাষ্ট্রপতি ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। তিনি বলেন, তৎকালীন সরকার এরশাদের বিরুদ্ধে শুধু দুর্নীতি মামলা দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, জেনারেল মঞ্জুর হত্যা মামলাও দায়ের করে। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় মামলাগুলো পুনরুজ্জীবিত করা হয়। আয়কর ফাঁকি, পাকিস্থানি জাহাজ ক্রয়ে দুর্নীতি ও সিমিটার ওয়েল সংক্রান্ত দুর্নীতি মামলা থেকে এরশাদ অব্যাহতি পান জোট সরকারের শেষ সময়ে। এসব মামলাও পুনরুজ্জীবিত করা হবে বলে শোনা যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে শেখ সিরাজ বলেন, নিষ্পত্তিকৃত মামলা পুনরুজ্জীবিত করা যায় না। Source:দৈনিক যুগান্তর
Date:2007-04-30

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: