এক বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ১৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ

সরকারি হিসাবেই এক বছর আগে যে পণ্য বা সেবা ১৫৪ টাকা ৩২ পয়সায় পাওয়া যেতো, এখন ওই একই পরিমাণ পণ্য বা সেবা পেতে খরচ করতে হয় ১৬৮ টাকা ৯৭ পয়সা। গত বছরের ফেব্রম্নয়ারি মাসে যে খাদ্যদ্রব্য ১৫৭ টাকা ২৩ পয়সায় পাওয়া যেতো, চলতি বছরের ফেব্রম্নয়ারিতে তা কিনতে ১৬৮ টাকা ৯৭ পয়সা লেগেছে। খাদ্য বহির্ভূত যে পণ্য ১৪৭ টাকা ৯৭ পয়সায় পাওয়া যেতো, এখন তা কিনতে লাগে ১৬৮ টাকা ৯৭ পয়সা। অর্থাৎ গত এক বছরের ব্যবধানে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ১৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ। তবে বেসরকারি হিসাবে জীবনযাত্রার ব্যয় আরো অনেক বেশি বেড়েছে বলে দাবি করেছেন দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে, তা কোনোভাবেই উপরের সরকারি তথ্যকে সমর্থন করে না।

বর্তমানে বাজারে সব জিনিসের দামই আকাশচুম্বী। সরকারি বিক্রয় কেন্দ্রে ১৫ টাকা কেজিতে চাল মিললেও বাজারে ২৪ টাকার নিচে কোনো চাল পাওয়া যায় না। প্রতিদিনই বাড়ছে চালসহ অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। সরকারের কোনো চেষ্টাই বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। সবাই আশা করেছিলেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে যেহেতু কেয়ারটেকার সরকার বেশ কিছুদিন ৰমতায় থাকবে, সেহেতু এ সময়টায় জিনিসপত্রের দাম একটু সহনীয় পর্যায়ে থাকবে। কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি। প্রতি লিটার সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়। আলুর মৌসুম শেষ হতে না হতেই প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকায়। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনোই এ সময় আলুর কেজি ১০ টাকার উপরে উঠেনি।

কাওসার মাহমুদ। একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন। সব মিলিয়ে ১৫ হাজার টাকার উপরে বেতন পান। অন্য কোনো উপার্জন নেই। এক ছেলে, এক মেয়ে। দু’জনেই স্কুলে পড়ালেখা করে। স্ত্রী গৃহিণী। ধানমন্ডিতে ভাড়া বাসায় থাকেন। এতোদিন মোটামুটি স্বাচ্ছন্দেই চলে যেতো। কিন্তু এখন আর চলে না। মাসের শেষে সংসারে টান পড়ে। প্রতি মাসেই ধার-দেনা করে চলতে হয়। গত বৃহস্পতিবার মতিঝিলে তার অফিসে আলাপকালে মি. কাওসার জানান, বলতেও খারাপ লাগে, খুব কষ্টে দিন কাটছে। জোড়াতালি দিয়ে চালাতে হচ্ছে সংসার।

আসলে কেউই ভালো নেই। ভালো নেই মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্তও। সাধারণ মানুষের জীবন চলা কঠিন হয়ে পড়েছে। দিন যতোই যাচ্ছে, তাদের দুর্ভোগ ততোই বাড়ছে। সত্যিই জোড়াতালি দিয়ে চলছে তাদের সংসার। নুন আনতে পানত্দা ফুরোনোর মতো অবস্থা। অভাব-অনটন লেগেই আছে সংসারে। কষ্টে কাটছে দিন। এর আগে কখনোই এমন বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়নি তাদের। হালের বাড়নত্দ দ্রব্যমূল্যের কারণে তাদের সংসারের বাজেট তছনছ হয়ে যাচ্ছে। আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে পারছেন না।

দফায় দফায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদু্যৎ ও পানির মূল্যবৃদ্ধি এবং পরিবহন, বাসা ভাড়াসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। সে সঙ্গে বাড়ছে মূল্যস্ফীতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, গত পাচ বছরে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ৪২ দশমিক ২৫ শতাংশ। আর ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ থেকে প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ বেড়ে বর্তমানে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশের কাছাকাছি পৌছেছে। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের আরেক দফা মূল্যবৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। আনত্দর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) মূল্যস্ফীতি যাতে কোনো অবস্থাতেই ১০ শতাংশের উপরে (ডাবল ডিজিট) না ওঠে সে জন্য এখনই কার্যকর পদৰেপ গ্রহণের জন্য সরকারকে পরামর্শ দিয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বুরোর তথ্য মতে, সাড়ে ৫ বছর আগে ২০০০-০১ অর্থবছরে গড় ভোক্তা মূল্যসূচক ছিল ১২৬ দশমিক ৭২ শতাংশ। গত ফেব্রম্নয়ারি মাসে তা বেড়ে ১৬৮ দশমিক ৯৭ শতাংশে উঠেছে। অর্থাৎ এ সময়ে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ৪২ দশমিক ২৫ শতাংশ। ওই সময় মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ। গত মার্চে তা বেড়ে ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশে দাড়িয়েছে।

শুক্রবার বাজার করার সময় শেওড়াপাড়ার অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা শহীদ সাহাবুদ্দিন জানান, আগে ২০০ টাকা নিয়ে বাজারে গেলে যা পাওয়া যেতো, এখন ৩০০ টাকা নিয়ে গেলেও তা মেলে না। তিনি বলেন, ছয়-সাত মাস আগেও ৮০ টাকায় এক কেজি তেলাপিয়া মাছ পাওয়া যেতো, এখন তা পেতে ১২৫ টাকা খরচ করতে হয়। গরম্নর মাংসের কেজি ১৮০ টাকা। এ পরিস্থিতিতে তার মতো অনেকেরই নাভিশ্বাস উঠেছে বলে দাবি করেন তিনি।

এদিকে গত কয়েক বছরে গড়ে ৫ শতাংশের উপরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির সুফল মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত দরিদ্র জনগোষ্ঠী কেউই পায়নি। মুষ্টিমেয় ধনী লোক এ সুফল ভোগ করেছে। আর এ কারণেই দারিদ্র্য বিমোচনের কাঙ্ৰিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে ৭ শতাংশের কাছাকাছি মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষকে প্রবৃদ্ধির সুফল থেকে বঞ্চিত করছে।

এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ড. আতিউর রহমান বলেন, মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্তদের সত্যিই এখন দুঃসময়। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ায় বাধ্য হয়ে তারা খরচ কমিয়ে দিচ্ছে। যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বাজারে। তিনি বলেন, প্রবৃদ্ধির সুফল সবাইকে সমানভাবে পৌছে দিতে না পারলে মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্তদের দুর্ভোগ ঘুচবে না। তাদের সঙ্কট দিন দিন আরো বাড়বে। ধনীরা আরো ধনী হবে। নিম্নবিত্তরা দরিদ্র হবে, মধ্যবিত্তরা নিম্নবিত্ত হবে। এভাবে দেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়তেই থাকবে।

সূত্রঃ http://www.jaijaidin.com/details.php?nid=8836

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: