কারাবন্দী রাজনীতিকরা অসুস্থঃ পরিবারে উদ্বেগ

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারসহ দেশের বিভিন্ন কারাগারে আটক রাজনীতিকদের অনেকেই এখন গুরুতর অসুস্থ। কারা হাসপাতাল এবং পিজি ও বারডেমসহ বিভিন্ন হাসপাতালে তাদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। আগ থেকেই অসুস্থতা, বয়স, মানসিক টেনশন, জটিল অসুখ বিসুখ, কারাগারের পরিবেশের সাথে খাপখাওয়াতে না পারা এবং প্রয়োজনমতো চিকিৎসার সুযোগ না থাকায় এসব নেতার অসুস্থতা বাড়ছে। কারো কারো অসুখ এতটাই জটিল যে, কারা কর্তৃপক্ষ সব সময়ই উদ্বিগ্ন থাকেন। তার ওপর কারা হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যবস্থার অপ্রতুলতা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্কট প্রভৃতি কারণে অসুস্থ নেতারা আরো অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশে জরুরি অবস্থা জারির পর এ পর্যন্ত বিশেষ অভিযানে আটক নেতাদের মধ্যে ৫২ জন ভিআইপি মর্যাদাসম্পন্ন। তাদের অনেকেরই বয়স ৬০ বছরের বেশি। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হার্টের বাইপাস সার্জারি, কিডনি, জটিল অ্যাজমাসহ এমন সব অসুখ-বিসুখ তাদের অনেকেরই রয়েছে, যা নিরাময়যোগ্য নয়। এসব অসুখ নিয়ন্ত্রণে রাখতে যে পরিবেশ, চিকিৎসা ও সেবার প্রয়োজন, তা জেলখানায় নেই। ফলে তারা ক্রমশই কাহিল ও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। স্বল্প চিকিৎসা দিয়ে তাদের সুস্থ করা যাচ্ছে না।
কারাগার ও হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, রংপুর জেলখানা থেকে ঢাকায় আনার পর ১৯ এপ্রিল গুরুতর হার্টের সমস্যায় অসুস্থ হয়ে পড়েন সাবেক মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী। ২০ এপ্রিল অচেতন অবস্থায় তাকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। আগ থেকেই তিনি উচ্চ রক্তচাপের রোগী। তার হার্টে এনজিও প্লাস্ট করা ছাড়াও বেশ ক’টি ব্লক রয়েছে। বর্তমানে তার ফুসফুসে পানি জমেছে। সেই অবস্থায় তাকে বারডেমে চিকিৎসা করা হচ্ছে। সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও আইনমন্ত্রী, খ্যাতিমান আইনবিদ ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ একজন হৃদরোগী। গ্রেফতারের পর তার ওপর মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাকে চার দিনের রিমান্ডে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। গতকাল কারাগারে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে জরুরিভাবে পিজি হাসপাতালে পাঠানো হয়। সত্তরোর্ধ্ব এই রাজনীতিবিদ কারাগারে সব সময়ই অত্যন্ত বিমর্ষ অবস্থায় থাকেন বলে জানা গেছে। তার অবস্থা বর্তমানে সঙ্কটাপন্ন। রক্তচাপ ছাড়াও তার কোমরে বাতের ব্যথা রয়েছে। আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য কামাল আহমেদ মজুমদার গ্রেফতারের পর থেকে এক দিনের জন্যও ভালো হননি। তিনি কথাবার্তা বলতে গেলে ভাঙা কণ্ঠস্বরে কথা বলেন। তার কাঁপুনি হয়। উঠে বেশিক্ষণ দাঁড়াতেও পারেন না। প্রায়ই তাকে পিজি হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করতে হয়। বিএনপি’র কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলাম ৫ ফেব্রুয়ারি আত্মসমর্পণ করেন যশোরে যৌথ বাহিনীর কাছে। তাকে গ্রেফতার করতে আসার পর তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাতে তাকে বাসায় চিকিৎসা দেয়া হয়। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনিতে প্রদাহ, অ্যাজমা, হার্টের বাইপাস সার্জারি নিয়ে তিনি কারা হাসপাতাল এবং প্রায় মাসখানেক ধরে পিজি হাসপাতালের প্রিজন সেলে চিকিৎসাধীন থাকার পর তাকে গত সপ্তাহে আবার কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। এই প্রবীণ নেতা প্রতি দিন ৩২ প্রকারের ওষুধ সেবন করেন বলে কারা হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে। সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা মোহামমদ নাসিম একজন জটিল পাইলস রোগী। তার খাওয়া-দাওয়ারও সমস্যা রয়েছে। তাকেও বাইরে রেখে চিকিৎসা দিয়ে আনতে হয়। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক আমলা ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর একজন হার্টের রোগী। তার উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা রয়েছে। কারা হাসপাতালে ছাড়াও তাকে বেশ কয়েকবার পিজি হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দিতে হয়েছে। ঢাকার সাবেক মেয়র ও মন্ত্রী মির্জ্জা আব্বাস গুরুতর কিডনি রোগে আক্রান্ত। তার শরীরে পানি জমছে। পা ফুলে গেছে। ডায়াবেটিসও বেড়ে গেছে। তাকে পিজি হাসপাতালের প্রিজন সেলে রাখা হয়েছে। সাবেক সংসদ সদস্য নাসিরউদ্দিন পিন্টু জটিল পাইলসে আক্রান্ত। তিনিও বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি। সাবেক প্রতিমন্ত্রী মীর নাছিরউদ্দিন হৃদরোগে আক্রান্ত। তার হার্টের সমস্যা রয়েছে। বগুড়া কারাগারে তার এক দফা স্ট্রোক করলে পরে ঢাকায় এনে পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদাও উচ্চ রক্তচাপ ও হার্টের সমস্যায় ভুগছেন। তাকে প্রতি দিন ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী বেশ কয়েক প্রকারের ওষুধ সেবন করতে হয়। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কারাগারে মারাত্মক অসুস্থ। তাকেও সেখানে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তিনি সব সময়ই চুপচাপ থাকেন। বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমানও অসুস্থ। রক্তচাপ, হার্টের সমস্যা আছে তার। আওয়ামী লীগ নেতা ওবায়দুল কাদের, জামায়াতের ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহামমদ তাহের, মোসাদ্দেক আলী ফালুসহ আটক অন্য সব নেতাও কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। নির্জন সেলে বন্দী তারেক রহমান শুরু থেকেই কোমরে ব্যথাসহ বেশ ক’টি উপসর্গে ভুগছেন। তাকে কারাগারের চিকিৎসকরা চিকিৎসা দিয়েছেন। তাকেও কোমরে ব্যথার চিকিৎসার জন্য পিজি হাসপাতালে নেয়া হয়।
কারাগার সূত্র জানিয়েছে, দেশের ৬৭টি কারাগারে বর্তমানে ডাক্তারের সংখ্যা মাত্র ২১ জন। কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে ডাক্তার আছেন মাত্র একজন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রায় ১০ হাজার বন্দী থাকলেও ডাক্তার আছেন মাত্র তিনজন। ফলে তারা চিকিৎসাসেবা প্রদানে হিমশিম খান। সারাদেশের কারাগারগুলোতে লক্ষাধিক বন্দীর জন্য ২১ জন ডাক্তার দিয়ে কিভাবে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব এর কোনো উত্তর তাদের কাছে নেই। যোগাযোগ করা হলে ঢাকা বিভাগের উপমহাকারা পরিদর্শক মেজর সামসুল হায়দার সিদ্দিকী জানান, কারাগারে বর্তমানে সবচেয়ে বড় সঙ্কট অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে। কারা কর্তৃপক্ষের হাতে কোনো জরুরি অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় বিশেষ প্রয়োজনে কোনো বন্দীকে বাইরে হাসপাতালে পাঠানোটাই সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। তিনি কারা হাসপাতালে চিকিৎসক সঙ্কটের কথাও স্বীকার করেন। বলেন, আমরা যতটা সম্ভব সাধ্য অনুযায়ী করার চেষ্টা করি। তবে অনেক ভিআইপি বন্দী আছেন যারা কারা জীবনের সাথে অভ্যস্ত না থাকায় সমস্যা দেখা দেয়। হাসপাতালে পাঠাতে দেরি হলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সমস্যা আরো জটিল হয়ে পড়ে।
এদিকে কারাগারে আটককৃতদের পরিবার-পরিজন বর্তমানে অসুস্থ নেতাদের জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। তারা প্রতি দিন কারাগার কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের চিকিৎসার ব্যাপারে খোঁজখবর নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।

Source:দৈনিক নয়া দিগন্ত
Date:2007-05-08

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: