গ্রেফতার বা হয়রানি করা হলে ভুল করবে সরকার

নানা টানাপোড়েন এবং মামলা ও আইনের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে কড়া নিরাপত্তায় ৫২ দিন পর স্বদেশের মাটিতে পা রাখলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল সোমবার বিকালে শেখ হাসিনা ইতিহাদ এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে ঢাকায় পৌঁছান। পরে বিমান বন্দরে ভিআইপি লাউঞ্জে অপেক্ষমাণ দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কুশল বিনিময় ও সাংবাদিকদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন। এ সময় তিনি বলেন, আমাকে গ্রেফতার বা হয়রানি করলে সরকার আবার ভুল করবে। এরপর তিনি ধানমন্ডিস্থ বঙ্গবন্ধু ভবনে রওনা হন। এ সময় বিমান বন্দর এলাকায় জড়ো হওয়া আওয়ামী লীগ ও বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের কয়েক হাজার নেতা-কর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষ জরুরি অবস্থার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে শ্লোগান দেয় এবং তার গাড়িবহর অনুসরণ করে অগ্রসর হয়। শেখ হাসিনাকে শুভেচ্ছা জানাতে বিমান বন্দর থেকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়ক পর্যন্ত রাজপথে হাজার হাজার মানুষ নেমে আসে। এই ঘটনায় নিরাপত্তাকর্মীদের সকলেই হতবাক হয়ে যায়। তবে নিরাপত্তা কর্মীরা তেমন বাধা সৃষ্টি করেনি।

শেখ হাসিনাকে বহনকারী ইতিহাদ এয়ারওয়েজের ফ্লাইটটি বিকাল পৌনে ৫টার কিছু আগে ঢাকা বিমান বন্দরে অবতরণ করে। পরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিমান থেকে নেমে আসলে দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জিল্লুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিলসহ উপস্থিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ তাকে অভ্যর্থনা জানান। দীর্ঘ পরিভ্রমণে ক্লান্ত শেখ হাসিনা দেশের মাটিতে পা রেখেই হাস্যোজ্জ্বল হয়ে ওঠেন। বিমান বন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে তিনি আগে-পিছে হাজার হাজার মানুষ এবং নিরাপত্তা প্রহরার মধ্যে ধানমন্ডির উদ্দেশ্যে যাওয়ার সময় পুরো রাস্তায় স্বাভাবিক যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। নেতা-কর্মীরা শেখ হাসিনার গাড়িবহর ঘিরে ধরে শ্লোগান দিতে থাকে। বিমান বন্দর থেকে তার ধানমন্ডির ৩২ নম্বর পর্যন্ত পৌঁছাতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে। দলীয় নেত্রীকে ফিরে পেয়ে আবেগে উচ্ছ্বাসিত নেতা-কর্মীরা শ্লোগান দিতে থাকে জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু। শেখ হাসিনা এগিয়ে চল আমরা আছি তোমার সাথে।

শেখ হাসিনা বিমান বন্দরে সাংবাদিকদের বলেন, আমি দেশের মাটিতে ফিরে এসেছি এটাই সবচেয়ে বড় কথা। বিদেশে থাকা অবস্থায় বর্তমান সরকার আমার সঙ্গে যে আচরণ করেছে তা শুধু এদেশের জনগণ নয়, গোটা বিশ্বের কেউ মেনে নিতে পারেনি। এজন্য তিনি পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেন এবং দেশের জনগণ, আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতা-কর্মী, দেশী-বিদেশী সংবাদ মাধ্যমসমূহের কর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। শেখ হাসিনা তার প্রতি সমর্থন জানানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য দেশের ভূমিকার কথাও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।

বিমান বন্দর থেকে শেখ হাসিনা সোজা ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধু ভবনে যান। সেখানে পৌঁছালে নেতা-কর্মীসহ সাধারণ মানুষ তাকে অভ্যর্থনা জানায়। পরে বঙ্গবন্ধু ভবনে তিনি নামাজ আদায় এবং জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী তার পুত্র ও কন্যার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য গত ১৫ মার্চ বৃটিশ এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে আমেরিকার উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন। ফিরতি টিকিটে ২৩ এপ্রিল তার দেশে ফিরে আসার কথা ছিল। আর সেই মোতাবেক তার টিকিটও কনফার্ম করা হয়। কিন্তু ১৮ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক প্রেসনোটের মাধ্যমে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। প্রেসনোটে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে ‘নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক ব্যক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তাকে ঢাকা পর্যন্ত বহন না করার জন্য সরকার দেশী-বিদেশী বিভিন্ন এয়ারল্যাইন্স কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠায়। এই নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পূর্ব নির্ধারিত তারিখেই তিনি ডালাস থেকে ফিরে আসার চেষ্টা করেন। কিন্তু সরকারের নিষেধাজ্ঞার কারণে বৃটিশ এয়ারওয়েজ তাদের কোন ফ্লাইটেই শেখ হাসিনাকে ঢাকা পর্যন্ত বোর্ডিং পাস দিতে অপারগতার কথা জানায়। পরে তাকে হিথ্রো বিমান বন্দর পর্যন্ত বোর্ডিং পাস দেয়া হয়। ১৯ এপ্রিল তিনি লন্ডনে পৌঁছান। হিথ্রো বিমান বন্দরে নেমে শেখ হাসিনা ২৩ এপ্রিলই দেশে ফেরার সিদ্ধান্তে অটল থাকার কথা জানিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, আমি অবশ্যই দেশে যাব। কি অন্যায় করেছি যে, আমাকে দেশে ঢুকতে দেয়া হবে না? আমি জাতির পিতার কন্যা। বাংলাদেশ আমার জন্মভূমি। জন্মস্থানে ফিরতে আমাকে সরকার বাধা দেবে কোন যুক্তিতে?

এরপর ২২ এপ্রিল শেখ হাসিনা দেশে ফেরার

উদ্দেশ্যে হিথ্রো বিমান বন্দরের বৃটিশ এয়ারওয়েজের ব্রিফিং কাউন্টারে উপস্থিত হয়ে তাদের ঢাকাগামী ফ্লাইটে বোর্ডিং পাস চান। কিন্তু আবারো তারা শেখ হাসিনাকে বোর্ডিং পাস প্রদানে অপারগতা প্রকাশ করে। ২৪ এপ্রিল শেখ হাসিনার পক্ষে তার প্রটোকল অফিসার মঞ্জিলা ফারুক সরকারি প্রেসনোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রীট পিটিশন দায়ের করেন। ২৫ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অপর এক প্রেসনোট জারির মাধ্যমে ১৮ এপ্রিল জারিকৃত প্রেসনোট প্রত্যাহার করে নেয়।

এদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে তাজুল ইসলাম ফারুক নামে জনৈক ব্যবসায়ী তার বিরুদ্ধে তিন কোটি টাকার ‘চাঁদাবাজি’র মামলা দায়ের করে। এরপর গত ২৮ অক্টোবর পল্টন মোড়ে সংঘটিত শিবির ক্যাডার হত্যা মামলায় পুলিশ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দেয়। আদালত থেকে শেখ হাসিনার নামে ওই মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। অবশ্য একদিন পরই আদালত এই গ্রেফতারি পরোয়ানার কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করে।

Source:দৈনিক ইত্তেফাক
Date:2007-05-08

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: