সংস্কার-নতুন দলের মধ্যমণি কারা?

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মেরুকরণ সৃষ্টির চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এই লক্ষ্যে একদিকে চলছে নির্বাচনী ও রাজনৈতিক সংস্কারের উদ্যোগ। পাশাপাশি শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের প্রক্রিয়াও। তবে সংস্কার না নতুন দল- কোনটি আগে, নাকি রাজনৈতিক সংস্কার ও নতুন দল গঠন দুটিই চলবে যুগপৎভাবে তা এখনো খোলাসা হয়নি। স্পষ্ট হয়নি এই দুই প্রক্রিয়ার মাঝখানে কারা খেলছেন বা এর মধ্যমণিই বা কে? তবে সবকিছুই নির্ভর করছে প্র্রধান দুটি রাজনৈতিক দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের গতিপ্রকৃতির ওপর। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপিতে যে সাংগঠনিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে তা সরকারের সংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অনুকূল হলেও আওয়ামী লীগে এখনো সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও চেইন অফ কমান্ড অটুট রয়েছে। এ কারণেই বিদ্যমান রাজনৈতিক শক্তিকে বিবেচনায় রেখেই সরকারকে অগ্রসর হতে হচ্ছে। সরকারের নীতি-নির্ধারকরা মনে করছেন, ‘মাইনাস টু থিওরি’র ভিত্তিতে প্রধান দুদলে সংস্কার বাস্তবায়ন করা সম্ভব না হলে নতুন দল গঠনের কার্যক্রম গতি পাবে না। সে ক্ষেত্রে এমনো হতে পারে-আপাতত নতুন দল নয়, বরং রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনায় যোগ হতে পারে নতুন কোনো উপাদান।
বর্তমানে সেনাবাহিনীর সমর্থনে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে একের পর এক উদ্যোগ নিতে থাকে। এর মধ্যে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে দল গঠনের চেষ্টা এবং প্রধান দুটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে সরকারের মাইনাস টু থিওরি ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করে। তবে নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করে ড. ইউনূস রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ পরিত্যাগ করায় এবং শেখ হাসিনার দৃঢ়তার কারণে মাইনাস টু থিওরি আপাতত ভেস্তে যাওয়ায় গোটা বিষয় নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে সরকারকে। সর্বশেষ সংস্কার প্রক্রিয়া জোরদারের পাশাপাশি বিএনপি-আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন দল থেকে প্রভাবশালী নেতাদের সমন্বিত করে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের প্রক্রিয়া জোরেশোরে শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে।
এদিকে নতুন দল গঠনের প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বেশ কিছু নেতার নাম শোনা গেলেও মূলত ত্রিধারায় বিভক্ত বিএনপির নেতারাই এ ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছেন। এর মধ্যে সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত এই দলটির নেতাদের মধ্যে ঢাকা মহানগর সভাপতি সিটি মেয়র সাদেক হোসেন খোকা, সাবেক মন্ত্রী ড. ওসমান ফারুক, সহসভাপতি মীর শওকত আলী ও যুগ্ম মহাসচিব গয়েশ্বর রায় দলীয় শীর্ষ নেতৃত্বের সমালোচনা করে এবং সংস্কার দাবি করে ইতিমধ্যে মুখ খুলেছেন। সর্বশেষ সাবেক অর্থমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য এম সাইফুর রহমানও মুখ খুলেছেন দলের ভেতরে সংস্কার দাবিতে। গতকাল শনিবার একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি দলের ভেতরে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার উল্লেখ করে পরিবারতন্ত্র ও চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিভিন্ন পদক্ষেপের সমালোচনা করেন। এই অংশটিকে পর্দার আড়াল থেকে বিএনপি মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভুঁইয়া সংগঠিত করছেন ও নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে অনেকে মনে করছেন। তবে গয়েশ্বর রায়ের ভূমিকা এখনো স্পষ্ট নয়। ধারণা করা হচ্ছে তিনি ভেতরে ভেতরে খালেদা জিয়ার সমর্থকদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন। বিএনপিতে এখন এই সংস্কারপন্থীদের দাপটে খালেদা জিয়া রীতিমতো কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। দলের গুটিকয়েক অগুরুত্বপূর্ণ নেতা ছাড়া আর কেউই তার সঙ্গে নেই।
আর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন তার উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) হান্নান শাহ, খালেদা জিয়ার ছোটভাই ও সদ্য মনোনীত সহসভাপতি মেজর (অব) সাঈদ এস্কান্দার, সাবেক প্রতিমন্ত্রী সেলিমা রহমান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আর এ গনি, বিগত বিএনপি-জামাত জোট সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা রিয়াজ রহমান প্রমুখ। তবে এখানেও সেলিমা রহমানের ভূমিকা প্রশ্নাতীত নয়। তিনি মান্নান ভুঁইয়ার নেতৃত্বাধীন সংস্কারপন্থীদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই অংশে আবার হান্নান শাহ এবং সাঈদ এস্কান্দারের মধ্যে নেতৃত্বের কাড়াকাড়ি একেবারেই স্পষ্ট। অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন, নতুন দল গঠনের প্রক্রিয়ায় বিএনপির সংস্কারপন্থীরা জড়িত রয়েছেন।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার ভূমিকা নিয়েও সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। এই দলটির দুজন প্রেসিডিয়াম সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও শেখ ফজলুল করিম সেলিম ইতিপূর্বে দলের ভেতরে সংস্কার দাবিতে মুখ খুললেও বর্তমানে তারা চুপ করে আছেন। আরো ৩ প্রেসিডিয়াম সদস্য আমির হোসেন আমু, আব্দুর রাজ্জাক এবং তোফায়েল আহমেদও ভেতরে সংস্কারপন্থী বলে বিভিন্ন সময় আলোচানায় এসেছে। নতুন দল গঠনের প্রক্রিয়ায়ও এদের নাম শোনা যাচ্ছে। তবে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর আওয়ামী লীগের সংস্কারপন্থীরা আর তেমন সক্রিয় নন। তারা দলীয় সভানেত্রীর কাছে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে এখন তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। শেখ হাসিনার সঙ্গে আলাপ করে অভ্যন্তরীণ সংস্কারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাও সম্ভাব্য নির্বাচনী আইনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে দলীয় অভ্যন্তরীন সংস্কারের উদ্যোগ নেবেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। প্রেসিডিয়াম সদস্য মতিয়া চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন। দলে কোনোরকম সংস্কার হলে তা শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই হতে হবে বলে তারা মনে করেন। প্রবীণ প্রেসিডিয়াম সদস্য জিল্লুর রহমানও শেখ হাসিনার প্রতি আস্থাশীল। এই অর্থে আওয়ামী লীগ আপাতত সংকটমুক্ত বলে মনে করা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগ-বিএনপি ছাড়াও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির সভাপতি ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীসহ এই দলের অনেক নেতা নতুন দলে যোগ দিতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে শোনা যাচ্ছে কাজী ফিরোজ রশিদসহ জাতীয় পার্টির অনেক নেতার নামও।
তবে নতুন দল গঠনের এই প্রক্রিয়ার সফলতা নিয়ে অনেকেরই সংশয় রয়েছে। আর এই সংশয়ের প্রধান কারণ হচ্ছে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বের সংকট। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, কে হবেন এই দলের প্রধান নেতা? শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে টেক্কা দেওয়ার মতো জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক দক্ষতা রয়েছে এমন নেতা কোথায়?
এ ক্ষেত্রে শোনা যাচ্ছে বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেনের নাম। তবে ড. কামাল হোসেনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত নয়। ড. কামাল হোসেন বরাবরই রাজনীতির এক রহস্য পুরুষ বলে খ্যাত। ভোটের বাজারে যেমন তিনি কখনই তার জনপ্রিয়তা প্রমাণ করতে পারেননি; তেমনি বারবার রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ নিলেও কোনোটাতেই সাফল্যের মুখ দেখেননি। এক সময়ের আওয়ামী লীগের তুখোড় নেতা ড. কামাল ১৯৯৩ সালে আওয়ামী লীগ ছেড়ে নতুন রাজনৈতিক ধারা সৃষ্টির কথা বলে গঠন করেন গণফোরাম। গণফোরাম রাজনীতিতে সাড়া জাগাতে না পারলে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে দেশের ছোট বাম দলগুলোকে নিয়ে গঠন করেন ১১ দলীয় জোট। পরবর্তী সময়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১১ দলকে সঙ্গে নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোটে যোগ দেন। কিন’ সমাজের নানা স্তরের লোকের সমন্বয়ে নিজস্ব একটি রাজনৈতিক ধারা সৃষ্টির লক্ষ্যে একই সঙ্গে চালাতে থাকেন ‘ঐক্যপ্রক্রিয়া’ নামে একটি প্লাটফর্ম তৈরির কাজ। এই উদ্যোগও তেমন অগ্রসর না হলে ১৪ দলের পাশাপাশি ডা. বদরুদ্দোজার বিকল্পধারাকে সঙ্গে নিয়ে গঠন করেন ‘জাতীয় ঐক্যমঞ্চ’। কিন’ এরই মধ্যে তৎকালীন বিএনপি-জামাত জোট সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন তুঙ্গে উঠলে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের স্রোতে তাও হারিয়ে যায়। শেষমেশ বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কার উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের প্রক্রিয়ায় আবারো উঠে এসেছে ড. কামাল হোসেনের নাম। শোনা যাচ্ছে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও এলডিপিসহ ছোট-বড়ো অনেক দলের অনেক নেতাই নতুন দল গঠনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। কিন’ তা সত্ত্বেও অতীতে ড. কামালের অসংখ্য উদ্যোগ আঁতুড় ঘরেই মারা যাওয়ায় এবারো তাকে নিয়ে তেমন আশাবাদী হতে পারছেন না কেউ।
এদিকে সরকারের রাজনৈতিক পরামর্শদাতারা মনে করছেন, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নিজ নিজ দলের নেতৃত্বে থাকলে নতুন দল গঠন করেও সরকারের উদ্দেশ্য সফল হবে না। এই অংশটি সরকারের মাইনাস-টু থিওরি যে কোনো মূল্যে বাস্তবায়নের পক্ষে। তবে দুনেত্রীকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় ভিন্ন কৌশলে এই লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করছে সরকার। জানা গেছে, দুনেত্রীর বিরুদ্ধে পুরোনো মামলাগুলো পুনরুজ্জীবিত করা হচ্ছে। এসব মামলা ব্যবহার করে নতুন নির্বাচনী আইনের আওতায় দুনেত্রী যাতে দলীয় পদে না থাকতে পারেন এবং নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন সেই ব্যবস্থা করা হবে। তবে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর দৃঢ় অবস্থান এবং তার প্রতি জনসমর্থনের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে আপাতত তাকে নাও ঘাটাতে পারে সরকার। সে ক্ষেত্রে বিএনপিই হবে সরকারের প্রধান টার্গেট। বিপর্যস্ত বিএনপিকে কফিনবন্দী করেই লক্ষ্য অর্জনের এগিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছেন নতুন দলের উদ্যোক্তারা।
তবে সরকারের ভেতরে বিকল্প চিন্তাও রয়েছে। নতুন দল গঠনের প্রক্রিয়া সফল না হলে শেষ চেষ্টা হিসেবে বিকল্পপন্থা অবলম্বন করা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বর্তমান ক্ষমতা কাঠামোয় আসতে পারে আমূল পরিবর্তন। রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনায় যোগ হতে পারে নতুন উপাদান।

Source:ভোরের কাগজ
Date:2007-05-13

Advertisements

3 Responses to সংস্কার-নতুন দলের মধ্যমণি কারা?

  1. Abd Al Mustafa বলেছেন:

    Assalamu Alaikum,

    Any chance of making the font a bit larger..??? you’ll need binoculars to read the text.

  2. aklim বলেছেন:

    i could not do that:(
    would you help?

  3. Abd Al Mustafa বলেছেন:

    apologies for the late reply, i have only just returned from a combined trip of performing umrah and then visiting my beautiful sylhet. what i usually do is do my typing in word where you can edit the size and font and then copy paste it to the blog…hope that helps. see the font size on my blog……http://sunnibarta.wordpress.com

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: