বাংলাদেশের দিকে বিশেষ নজর যুক্তরাষ্ট্রের

বাংলাদেশের দিকে এখন বিশেষ দৃষ্টি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। যুক্তরাষ্ট্র বার বার জানতে চাইছে কবে এবং কতদিনের মধ্যে বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন হবে। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশীয় বিষয়ক কর্মকর্তা এবং প্রভাবশালী কংগ্রেসম্যানেরা জানতে চেয়েছেন, কোন্‌ ধরনের সরকার দেশ চালাচ্ছে ? এক সপ্তাহের সফরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত ফারুক সোবহান এসব প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন। এর জবাবে বিশেষ দূত স্পষ্ট জানিয়েছেন, মিলিটারী নয়, সরকারে প্রধান ড. ফখরুদ্দীন আহমদ এবং তার সঙ্গে আছেন আরো ১০ জন উপদেষ্টা। সুশাসনের ব্যাপারে পূর্ণ আন্তরিক একটি চৌকস বেসামরিক টিম এই সরকার পরিচালনা করছেন। এদিকে ফারুক সোবহানের সাথে বৈঠকে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন বাংলাদেশ সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন এবং দেশে একটি অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানে বিশ্ব সংস্থার পক্ষে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি এবং দেশে আগামী নির্বাচন বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানাতে গত ৩ মে শুরু হয় ঝানু কূটনীতিক ফারুক সোবহানের যুক্তরাষ্ট্র সফর। তিনি সেখানে গিয়ে কথা বলেন পররাষ্ট্র দপ্তরের আন্ডার সেক্রেটারি নিকোলাস বার্নসসহ অন্যান্য নীতিনির্ধারকের সঙ্গে। বাংলাদেশ ককাসের কো-চেয়ারম্যান কংগ্রেসম্যান যোসেফ ক্রাউলিসহ কয়েকজন প্রভাবশালী আইন প্রণেতার সঙ্গেও মতবিনিময় করেন তিনি। ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক হয় তার। এছাড়া তিনি কথা বলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনীতিবিদ এবং কর্মকর্তাদের সাথে।

ফারুক সোবহান তার এই কূটনৈতিক মিশনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশেষ করে আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। অর্থনৈতিক বিষয় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের প্রবেশাধিকার নিয়ে আলোচনা করেন। ট্রেড এ্যাক্ট অব ২০০৭-এর আওতায় বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিয়ে সিনেটর ও কংগ্রেসম্যানদের সঙ্গে কথা হয় তার। এরই ফলাফলের ভিত্তিতে তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, নতুন ট্রেড (ট্যারিফ রিলিফ এ্যাসিস্টেন্স অব ডেভেলপমেন্ট ইকনমিকস) এ্যাক্ট হলে বাংলাদেশ শতভাগ পণ্য রপ্তানির সুবিধা পাবে।

ফারুক সোবহান এই বিশেষ মিশনে নিকোলাস বার্নসের সাথে বৈঠকের বিষয়ে জানান, খুব ভালো বৈঠক হয়েছে। বাংলাদেশ সম্পর্কে ওদের ভুল ধারণা ছিল। তাদের সবচেয়ে আগ্রহের প্রশ্ন ছিল বাংলাদেশে এখন যে ধরনের সরকার আছে তাকে কি মিলিটারী সরকার হিসাবে ধরা যায়, নাকি এটা অন্য কোন ধরনের সরকার? এর উত্তরে তিনি জানান, আমি তাদের বোঝাতে চেষ্টা করেছি এটি একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এর প্রধান হলেন ড. ফখরুদ্দীন আহমেদ। আর তার সঙ্গে আছেন ১০ জন উপদেষ্টা। তারাই সরকার চালাচ্ছেন। দ্বিতীয় প্রশ্নটা ছিল নির্বাচন কবে হবে এবং কেন এত সময় লাগছে? এর উত্তরে তিনি ঐ সকল প্রভাবশালী কর্মকর্তাকে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন যে সময় সরকার বলেছে সেই সময়ের মধ্যেই নির্বাচন হবে। নতুন ভোটার লিষ্ট করতে হবে, যা হবে ছবিযুক্ত। এই কাজের জন্য ডাটা প্রসেস করতে হবে। দিতে হবে প্রশিক্ষণ। প্রধান উপদেষ্টা এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার তাড়াতাড়ি যেন নির্বাচন হয়, সেই চেষ্টাই করছেন। কংগ্রেস সদস্যরা বারবার বলেছেন নির্বাচনের জন্য সময় নির্ধারণ প্রসঙ্গে। নিকোলাস বার্নস, জন গেষ্টরাইট কিংবা ড. ক্রাউস, চালর্স র‌্যা গেসের সাথেও বিশেষ দূত বৈঠক করেছেন। এ কর্মকর্তারাও বাংলাদেশের নির্বাচনের বিষয়ে কথা বলেছেন। ফারুক সোবহান বলেন, বেশ কিছু বিষয়ে ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে। সাতদিনের সফরে এই সকল ভুল বোঝাবুঝির অবসান হবার সুযোগ কম। এজন্য আরো কাজ করতে হবে। শিগগিরই ওয়াশিংটনে নতুন রাষ্ট্রদূত যাচ্ছেন। বিশেষ দূতের বৈঠকের ধারাবাহিকতা তিনি দেখবেন। বিশেষ দূত বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ধরে রাখাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ দূতের এই বিশেষ কূটনৈতিক সফরের পর মনে করা হচ্ছে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির দিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দৃষ্টি রয়েছে। আর এ কারণেই কিছুদিনের মধ্যেই বাংলাদেশ সফরে আসছেন মর্াকিন ডেপুটি অ্যাসিস্টেন্ট সেক্রেটারী অফ স্টেট জন গেষ্টরাইট। তিনি এ সফরে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন, সরকারের কর্মকাণ্ড এবং আনুষঙ্গিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলবেন বলে জানা গেছে। তবে এখনো গেষ্টরাইটের সফরের দিন-তারিখ ঠিক হয়নি।

জাতিসংঘ মহাসচিবের সাথে বিশেষ দূতের বৈঠক

এদিকে বাসস জানায়, জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন বাংলাদেশ সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন এবং দেশে একটি অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানে বিশ্ব সংস্থার পক্ষে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।

গত শুক্রবার জাতিসংঘ সদর দফতরে বান কি মুনের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত ফারুক সোবহানের বৈঠককালে জাতিসংঘ মহাসচিব এই সন্তোষ প্রকাশ করেন।

এ সময় বিশেষ দূত মহাসচিবকে বাংলাদেশে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গৃহীত বিভিন্ন সংস্কার পদক্ষেপের কথা অবহিত করেন।

বিশেষ দূত ফারুক সোবহান গতকাল নিউইয়র্কে ব্যস্ত দিন অতিবাহিত করেন। এ সময় তিনি জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেলসহ সংস্থার বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

ফারুক সোবহান জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের কাছে বর্তমান সরকার গৃহীত সংস্কার কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। তিনি জানান, সুশাসনের ব্যাপারে পূর্ণ আন্তরিক একটি চৌকস বেসামরিক টিম এই সরকার পরিচালনা করছেন। তারা সুশাসনের লক্ষ্যে পূর্ণ অঙ্গীকারাবদ্ধ।

তিনি আরো বলেন, তার টিম সম্ভাব্য স্বল্পতম সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানে কঠোর পরিশ্রম করছে এবং সরকার ইতোমধ্যে বিগত সরকারগুলোর আমলে ভেঙে পড়া প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

ফারুক সোবহান জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের অবহিত করেন যে, দুর্নীতি দমন কমিশন সম্পূর্ণভাবে সক্রিয় এবং সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হয়েছে। তিনি সরকারের দুর্নীতি বিরোধী অব্যাহত অভিযান সম্পর্কে তাদের অবহিত করে বলেন, বিদেশে পাচার করা অর্থ উদ্ধার ও তা দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকার জাতিসংঘের সহায়তাকে স্বাগত জানাবে।

জাতিসংঘ কর্মকর্তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার গৃহীত সাম্প্রতিক পদক্ষেপসমূহে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং সরকারের একজন উচ্চ পর্যায়ের দূত মারফত এ ব্রিফিংয়ের প্রশংসা করেন।

কর্মকর্তারা নির্বাচন কমিশনকে সামর্থ্য ও ক্ষমতা অনুযায়ী জাতিসংঘের পূর্ণাঙ্গ কারিগরি ও আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দেন।

Source:দৈনিক ইত্তেফাক
Date:2007-05-13

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: