ব্যর্থতার অভিযোগ নিয়ে মেয়র খোকার মেয়াদ পূর্তি হচ্ছে কাল

ঢাকার মেয়র সাদেক হোসেন খোকার মেয়াদ আগামীকাল শেষ হচ্ছে। মেয়াদের একেবারে শেষে এসে নিজ দলের সমালোচনা করে তিনি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। পাঁচ বছর মেয়াদে মেয়রের দায়িত্ব পালনে তার যেমন কিছু সফলতা রয়েছে তেমনি তার বিরুদ্ধে রয়েছে বিস্তর দুর্নীতি ও ব্যর্থতার অভিযোগ। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় অঙ্কের কমিশন গ্রহণ, দলীয় ও আত্মীয়করণ, নিয়োগ বাণিজ্যসহ নানান অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

চলমান দুর্নীতি দমন অভিযানে তিনি ফেঁসে যেতে পারেন এমন আফঙ্কা শুরু থেকেই শোনা যাচ্ছিল। এ নিয়ে তাকে বেশ চিন্তিতও দেখা গেছে। সর্বশেষে মেয়াদ শেষের মাত্র এক সপ্তাহ আগে তিনি দলীয় সভানেত্রীর ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ এবং দেশের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য বিএনপিকে দায়ী করে মিডিয়ায় বক্তব্য দিয়ে আলোচনার ঝড় তুলেছেন। বিএনপি’র একটি সূত্র মনে করে, দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার এড়াতে শেষ মুহূর্তে এসে মেয়র খোকা এভাবে প্রকাশ্যে দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।
তবে মেয়র খোকা নয়া দিগন্তকে বলেছেন, আত্মরক্ষা তথা গ্রেফতার এড়ানোর জন্য বক্তব্য দিয়েছেন এমন কোনো বিষয় তার জানা নেই। এই মুহূর্তে দেশ, দল ও দলের চেয়ারপারসনের মঙ্গলের কথা চিন্তা করেই বক্তব্য দিয়েছেন। মেয়র হিসেবে নিজেকে অনেকটাই সফল দাবি করে তিনি। নিজে কোনো রকমের দুর্নীতির সাথে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে বলেন, আমি মনে করি পাঁচ বছরে ডিসিসিতে দুর্নীতির মাত্রা কিছুটা হলেও কমিয়ে আনতে পেরেছি। বিশেষ করে ডিসিসিতে আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পেরেছেন বলে দাবি করেন।

বিএনপি’র ঢাকা মহানগরী সভাপতি সাদেক হোসেন খোকা ২০০২ সালে বিএনপির টিকিটে ঢাকা সিটি করপোরেশনের (ডিসিসি) মেয়র নির্বাচিত হন। তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ সে নির্বাচন বর্জন করে। খোকা ঢাকার দ্বিতীয় নির্বাচিত মেয়র। ওই বছরের ১৫ মে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আগামীকাল সোমবার তার পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ হচ্ছে। ডিসিসি’র আইন অনুযায়ী আরেকজন মেয়র নির্বাচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত আগের মেয়র দায়িত্ব পালন করে যাবেন। তবে দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর একজন প্রশাসক নিযোগ করা হতে পারে বলে গুঞ্জন শোনা গিয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি উপদেষ্টা পরিষদের এক বৈঠকে পরবর্তী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত আগের মেয়রের দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়। এ হিসেবে মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও মেয়র খোকা দায়িত্ব পালন করে যাবেন বলে বলে মনে করা হচ্ছে। এর আগে ডিসিসি’র প্রথম নির্বাচিত মেয়র মরহুম মোঃ হানিফ তার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও পরবর্তী নির্বাচনের আগ পর্যন্ত প্রায় তিন বছর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মেয়র খোকা গতকাল রাতে বলেছেন, ডিসিসি’র আইন অনুযায়ী পরবর্তী মেয়র না আসা পর্যন্ত তাকে দায়িত্ব পালন করে যেতে হবে। সরকার যদি তাকে সরে যেতে বলে বা বাদ দেয় সেটা ভিন্ন কথা। তবে গতকাল পর্যন্ত এ ধরনের কোনো নিদের্শনা তার কাছে কারো পক্ষ থেকে আসেনি বলে তিনি এ প্রতিবেদককে জানান।
বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন বিগত জোট সরকারের সময়ে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি সরকারি আনুকূল্য নিয়ে দায়িত্ব পালন করেন। প্রায় ৬৩১ কোটি দেনার দায়ে ভারাক্রান্ত ডিসিসি’র দায়িত্ব নিলেও পাঁচ বছরে ডিসিসি’র বাজেটকে প্রায় তিনগুণ করেন। যেখানে ২০০১-২০০২ বাজেট ধরা হয়েছিল ৫৬২ কোটি টাকা, নিজের প্রথম বাজেট ২০০২- ২০০৩ অর্থবছরে তা বাড়িয়ে ৬৭৭ কোটি টাকা করেন। সর্বশেষ ২০০৬-২০০৭ অর্থবছরে ১ হাজার ৫০৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকার বাজেট দেন। যা তার আগের অর্থবছরের চেয়ে ৭৬৮ কোটি ২১ লাখ টাকা বেশি। এ বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় ধরেন ১ হাজার ২৪৫ কোটি ১৪ লাখ টাকা। এ সময়ের মধ্যে সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন, ড্রেন, বক্স কালভার্ট নির্মাণ ও উন্নয়ন, ফুটপাথ নির্মাণ/পুনর্নির্মাণ, ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ, ইলেক্ট্রনিক ট্রাফিক সিগনাল স্থাপন, কয়েকটি মার্কেট নির্মাণ, গাড়ি পার্কিং ও বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের কার্যক্রম গ্রহণ এবং গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার নির্মাণের মতো বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তবে এসব উন্নয়ন কার্যক্রমেরই প্রায় প্রত্যেকটিতে নির্ধারিত কমিশন নেয়াসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে মেয়রের বিরুদ্ধে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ডিসিসি’র বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন গ্রহণ নগর ভবনের পুরনো রেওয়াজ। মেয়র খোকাও তা থেকে বিরত থাকতে পারেননি। বরং তিনি যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার, সিটি সেন্টার নির্মাণ প্রকল্পের মতো বড় বড় প্রকল্প গ্রহণ করে বড় অঙ্কের কমিশন গ্রহণে বেশি ঝুঁকে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি কয়েক দফায় ডিসিসিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয়করণ, আত্মীয়করণ ছাড়াও উৎকোচ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
মেয়র হিসেবে মহানগরীর প্রধান সমস্যাগুলো সমাধানে তিনি আগের মেয়রের ধারাবাহিকতায় ব্যর্থতারই পরিচয় দিয়েছেন। মশা, আবর্জনা, যানজট, রাস্তায় খোঁড়াখুঁড়ি, ড্রেন নর্দমা, ফুটপাথ ইত্যাদি সমস্যা আগের মতোই রয়ে গেছে। মশক নিধনের জন্য বাজেটে প্রতি বছর ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখলেও অধিকাংশ এলাকায় মশার উৎপাত বরাবরের মতোই আছে। জনসচেতনতা বৃদ্ধির কারণে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হার হ্রাস পেলেও ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা গেছে প্রতিবছরই। মশক নিধনের জন্য ওষুধ ছিটানো ও জলাশয়ের কচুরিপানা কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। অথচ এ খাতে কাগজে-কলমে কোটি কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। আবর্জনা পরিস্থিতিও আগের মতোই ভয়াবহ। কিছু নির্দিষ্ট এলাকার কথা বাদ দিলে পুরো নগরীতে এখনো আগের মতোই আবর্জনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকে। নির্দিষ্ট সময়ে সরানো হয় না। সরিয়ে ফেলার জন্য চার বছরেও নতুন কোনো ডাম্পিং স্টেশন স্থাপন করতে পারেননি। কিছু ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করা হলেও শাহবাগ, বাংলামোটর, পরিবাগ, দৈনিক বাংলামোড়, প্রেসক্লাব, পল্টন মোড়ের মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে কোনো ফুটওভার ব্রিজ বা আন্ডার পাস নির্মাণ করতে পারেননি। ফুটপাথগুলোকে হকার ও নির্মাণ সমাগ্রীমুক্ত করার জন্য মেয়র কোনো পদক্ষেপ নেননি। সর্বশেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে ফুটপাথ হকারমুক্ত করেছে। নগরীর পার্কগুলো উদ্ধার ও সংস্কারে উল্লেখযোগ্য কিছু করতে পারেননি। নগরভবন সংলগ্ন ওসমানী উদ্যান সংস্কারের কার্যক্রম গ্রহণ করা হলেও তা এখনো শেষ হয়নি। মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি বলেছিলেন, নগরীর রাস্তাগুলো এমনভাবে সংস্কার করা হবে যাতে পাঁচ বছর তাতে হাত দেয়া না লাগে। কিন্তু তা বাস্তবে হয়নি। প্রতি বছরই প্রতিটি সড়কে হাত দিতে হয়েছে। এ খাতে প্রতি বছরই ব্যয় বৃদ্ধি করা হয়েছে। এখনো নগরীর মূল সড়ক বাদ দিলে ভেতরের সড়ক ও গলির অধিকাংশই সংস্কারহীন। ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে দীর্ঘ দিন।

রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও মেয়র হিসেবে আয়েশী জীবনযাপনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তিনি বেলা সাড়ে ১২টা-১টার আগে সচরাচর নগরভবনে আসেননি। নগরভবনে তার উপস্থিতি ছিল অনিয়মিত। আনুষ্ঠানিক কোনো কার্যক্রম ছাড়া স্বউদ্যোগে নগরবাসীর অবস্থা জানা বা দেখার জন্য তিনি আকস্মিক কোথাও কোনো দিন বের হয়েছেন এমন নজির নেই। গুলশানে বিলাসবহুল মেয়র ভবন খালি পড়ে থাকলেও তিনি থেকেছেন মিন্টু রোডে মন্ত্রীদের জন্য নির্ধারিত বাড়িতে।
দলীয় পরিচয়ে নির্বাচিত কয়েকজন কমিশনার ও নগরভবনের কয়েকজন কর্মকর্তা ছিল মেয়রের সব কাজের সহযোগী। দুর্নীতিবাজ হিসেবে পরিচিতি চিহ্নিত এসব কর্মকর্তাই মেয়রকে তাদের চক্রে নিয়ে যান। ফলে সৎ ও সাহসী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ডিসি সোলায়মান, সাবেক সচিব এ এফ এম সুলায়মান চৌধুরী ডিসিসি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পেয়ে তিন মাসও থাকতে পারেননি।
দুর্নীতির সহযোগী না হওয়ায় আরো কয়েকজন কর্মকর্তাকে বিভিন্ন সময় নগরভবন ছাড়তে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই পরিপ্রেক্ষিতে চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে মেয়র খোকার গ্রেফতারের বিষয়টি সবার মুখে মুখে ছিল। বিশেষ করে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত কয়েকজন কমিশনার গ্রেফতার ও অন্যরা আত্মগোপনে চলে যাওয়ার পর তিনি শঙ্কিত হয়ে পড়েন। এক সপ্তাহ আগ পর্যন্তও তাকে বেশ বিপর্যস্ত দেখা যায়। বিশেষ করে কয়েক দিন আগে দলের চেয়ারপারসনের সাথে সাক্ষাৎ করে আসার পর তাকে বেশ বিমর্ষ দেখায়। এদিকে তাকে গ্রেফতার করা হতে পারে এমন একটি কথাও শোনা যায়। এ অবস্থায় গত বৃহসপতিবার তিনি দল ও দলের চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে বসেন। ভবিষ্যতে কোনো রাজনীতি না করার ঘোষণা দেন।
মেয়র হিসেবে নিজের মূল্যায়ন জানতে চাইলে সাদেক হোসেন খোকা বলেন, দেখুন সব কিছু একটি সিস্টেমের মধ্যে চলে। ঋণের বোঝা নিয়ে দায়িত্ব নেয়ার পর এখন ডিসিসিতে একটি আর্থিক শৃঙ্খলা আনতে পেরেছি। আগে যেমন নগরভবনে ফাইভ স্টার সেভেন স্টার গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে আমার বিগত পাঁচ বছরে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। তা ছাড়া আমি যেসব উন্নয়ন কাজ করেছি তার সুফল নগরবাসী ভোগ করছে। এ হিসেবে আমি নিজেকে পুরো সফল দাবি না করলেও অনেকটাই সফল দাবি করতে পারি। মেয়র ডিসিসিতে দুর্নীতির মাত্রা কমিয়ে আনতে পেরেছেন বলেও দাবি করেন। কমিশন গ্রহণসহ অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের ব্যাপারে তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে যেভাবে দুর্নীতির কথা বলা হচ্ছে তার কোনো ভিত্তি নেই। কেউ সুনির্দিষ্ট করে কোনো দুর্নীতির প্রমাণ দেখাতে পারলে সে ব্যাপারে জবাব দিতে পারি।

Source:দৈনিক নয়া দিগন্ত
Date:2007-05-13

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: