রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্রের অবসান চান বিএনপি নেতারা

বিএনপিতে সংস্কারের দাবি জোরদার হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের কেউ কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন। চেয়ারপার্সনের ক্ষমতা সীমিত করার পক্ষে পাল্লা ভারী হচ্ছে ক্রমাগত। পরিবারতন্ত্রের অবসান, এককেন্দ্রিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, দলের অন্দর-বাইরে সর্বব্যাপী ব্যাপক সংস্কার, গঠনতন্ত্রের পরিবর্তন-পরিবর্ধনের কথা এখন বলছেন অনেক নেতাই। বিএনপি মহানগর সভাপতি ঢাকার মেয়র সাদেক হোসেন খোকার পর মুখ খুলেছেন দলের প্রবীণ নেতা বিএনপি’র স্খায়ী কমিটির সদস্য সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান এবং আরেক নেতা সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. ওসমান ফারুক। সংস্কারের কথা বলেছেন দলের যুগ্ম মহাসচিব সেলিমা রহমানও। অচিরেই আরো কেউ কেউ প্রকাশ্যে তাদের বক্তব্য উপস্খাপন করবেন বলে আভাস পাওয়া গেছে। বিএনপি’র প্রবীণতম নেতা সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান বলেছেন, রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্রের অবসান হওয়া উচিত। দলের গঠনতন্ত্র সংশোধন ও সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন, বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরীর পরিবর্তে রাষ্ট্রপতিকে প্রধান উপদেষ্টা করা ছিল মারাত্মক ভুল। গতকাল এনটিভিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সাইফুর রহমান জানান, তিনি ভবিষ্যতে আর নির্বাচন করবেন না। দলের গুরুত্বপূর্ণ কোন পদেও যাবেন না। তিনি নতুন রাজনৈতিক দলের পক্ষে মত দিয়ে বলেন, সেটা ভাল, তবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মত যেন না হয়। তিনি বলেন, নির্বাচনের জন্য ১৮ মাস সময় অনেক বেশি। ১২ মাসের মধ্যে নির্বাচন হওয়া উচিত। ওসমান ফারুক সরাসরি বললেন, বিগত ২২ জানুয়ারি নির্বাচন হলে দেশে গৃহযুদ্ধ লেগে যেত। বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ যথাযথই সংস্কারপন্থী বলে পরিচিত। তিনি বলেন, মানুষ পরিবারতন্ত্র পছন্দ করে না, সংস্কার চায়।

তবে এ বিষয়ে দলের চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) হান্নান শাহ বলেছেন, যারা দাবি করছেন তাদের সবকিছু পাওয়া হয়ে গেছে। চাওয়া-পাওয়ার আর কিছু নেই, তারাই চেয়ারপার্সনের ক্ষমতা খর্ব করতে চান। মনে রাখতে হবে চেয়ারপার্সন একা কিছুই করেন না, তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনে চেয়ারপার্সন। তাই তার একক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা রয়েছে। তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, ঘরোয়া রাজনীতি শুরু হলেই তিনি দলের সংস্কারের কাজে হাত দিবেন। দলের কাউন্সিলই সিদ্ধান্ত নেবে কোন কোন ক্ষেত্রে সংস্কার হবে। বিএনপি’র মুখপাত্র নজরুল ইসলাম খান ইত্তেফাককে বলেন, দলের চেয়ারপার্সন সংস্কারের পক্ষে। বর্তমানে রাজনীতি নিষিদ্ধ। ঘরোয়া রাজনীতি শুরু হলে সংস্কার প্রক্রিয়াও শুরু হবে। তিনি সাদেক হোসেন খোকা ও ড. ওসমান ফারুকের বক্তব্য প্রসঙ্গে বলেন, ওটা তাদের নিজস্ব বক্তব্য।

এদিকে গতকাল ড. ওসমান ফারুক সাংবাদিকদের বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষ রাজনৈতিক দলের মধ্যে এখন আর পরিবারতন্ত্র দেখতে চায় না। বিএনপিতে সংস্কার জরুরি। দল পরিচালনায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্ব”ছতা ও জবাবদিহিতা থাকা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, দুর্নীতিবাজ প্রমাণ হলে যে কারো বিরুদ্ধে দলকে কঠোর ব্যবস’া নিতে হবে। ড. ওসমান ফারুক দলের চেয়ারপার্সনের ছোট ভাই মেজর (অবঃ) সাঈদ এস্কান্দারকে সহ-সভাপতি নিয়োগ করার বিরুদ্ধে তার সুস্পষ্ট অবস’ানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, যখন দলে সংস্কারের কথা উ”চারিত হ”েছ সেই সময়ে এই নিয়োগ প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। চেয়ারপার্সন যে কাউকে নিয়োগ দিতে পারেন, গঠনতন্ত্র তাকে সেই ক্ষমতা প্রদান করেছে। তবে এই সময়ে এই নিয়োগ ঠিক হয়নি।

রাজনৈতিক দলের মধ্যে চলমান পরিবারতন্ত্র সম্পর্কে তিনি বলেন, মানুষ এখন গণতন্ত্র চায়। পরিবারের হাত ধরে রাজনীতিতে আসার প্রবণতা কেবল বাংলাদেশে নয়, ভারত, পাকিস্তানেও আছে। বিএনপি, আওয়ামী লীগ, এলডিপিতে এর নজির রয়েছে। তবে এই পরিবারতন্ত্র মানুষ ভাল চোখে দেখছে না। তিনি আরো বলেন, সময়ের প্রয়োজনে বিএনপিতে এখন সংস্কারের কোন বিকল্প নেই। দলের গঠনতন্ত্র, নেতৃত্ব নির্বাচন পদ্ধতি, জেলা কমিটির নেতা নির্বাচন ব্যবস’ায় ব্যাপক সংস্কার আনতে হবে। দলের যেকোন স্তরে নেতৃত্ব নির্বাচনে থাকতে হবে কর্মী-সমর্থকদের মতামতের প্রতিফলন। তা না হলে দলের ভেতরে গ্রুপিং বা দ্বন্দ্ব কোনটাই শেষ হবে না। প্রতিটি স্তরে নেতা নির্বাচনে একটি স্ব”ছ ব্যবস’া চালু করতে হবে, যেন নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে কর্মীদের মধ্যে কোন প্রশ্ন না ওঠে। ওসমান ফারুক অবশ্য বলেছেন, চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া সংস্কার চান। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া একজন জনপ্রিয় নেত্রী। সময় বলে দেবে ম্যাডাম কীভাবে সংস্কার কর্মসূচি শুরু করবেন।

দুর্নীতিবাজদের ব্যাপারে বিএনপি চেয়ারপার্সনের অবস্খান ব্যাখ্যা করে ড. ফারুক বলেন, দলের ভেতরে যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে বিচারে তারা দোষী প্রমাণিত হলে অবশ্যই তিনি ব্যবস্খা নেবেন। খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব এখন চ্যালেঞ্জের মুখে কিনা জানতে চাইলে ওসমান ফারুক বলেন, গৃহবধূ থেকে খালেদা জিয়া রাজনীতিতে এসেছেন। তিনি একজন ‘ক্যারিশমেটিক লিডার’। এটাই তার বড় শক্তি। শহীদ জিয়ার প্রতিষ্ঠিত বিএনপি খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ব্যাপকতা ও জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কিন’ দলকে সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী করতে হলে তাকে সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। সময়ের প্রয়োজনে এর কোন বিকল্প নেই।

ড. ওসমান ফারুক বলেন, ২২ জানুয়ারির নির্বাচন হলে দেশ ভয়াবহ পরিণতির দিকে এগিয়ে যেত। সেই অনিবার্য পরিণতি ঠেকানোর উপায় ছিল না। ঐ নির্বাচন হতো রক্তক্ষয়ী নির্বাচন। একতরফা নির্বাচন। যেটা সিভিল ওয়ার (গৃহযুদ্ধের) মত অবস্খা সৃষ্টি করতো। শুক্রবার একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ড. ওসমান ফারুক একথা বলেন। তিনি বলেন, আমি মনে করি এই পরিসি’তির জন্য কেবল বিএনপি নয়, সকল দলকে দায় বহন করতে হবে। উক্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমি মনে করি এখন যত দ্রুত নির্বাচন করা যায় ভাল। অনির্বাচিত সরকারের সুবিধা যেমন আছে অসুবিধাও আছে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলের সংস্কারগুলো দলের ভেতর থেকে হওয়া উচিত। বাইরে থেকে চাপিয়ে দেয়া সংস্কার টেকে না।

সেলিমা রহমান বলেন, দলে সংস্কার দরকার। এই সংস্কারের প্রশ্নে দলের চেয়ারপার্সনেরও দ্বিমত নেই। তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি (খালেদা জিয়া) দলে সংস্কার করা হবে বলে জানিয়েছেন। ঘরোয়া রাজনীতি চালু হলে এই প্রক্রিয়াও শুরু হবে।
Source:দৈনিক ইত্তেফাক
Date:2007-05-13

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: