খালেদার দুঃসময়ে শরিকরা ঘাপটি মেরেছে

বিএনপির এই দুঃসময়ে তার চারদলীয় জোটের শরিক অন্য তিন দলের কাউকে কাছে পাওয়া যাচ্ছে না। জামাত ও ইসলামী ঐক্যজোট, বিজেপি কেউই বিএনপির পাশে নেই। ঘরোয়া রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলেই চারদলীয় জোট থেকে বের হয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেবে বিএনপির প্রধানমিত্র জামাতে ইসলামী। বিএনপি-জামাত জোট সরকারের শাসনের সময় জামাত নেতা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী তার ওয়াজ মাহফিলে প্রায়ই বলতেন, বিএনপি জামাত একই মায়ের পেটের দুই ভাই। ইসলামী ঐক্যজোটের নেতা ফজলুল হক আমিনী বলতেন, রোজ কেয়ামত পর্যন্ত চারদলীয় ঐক্যজোটের ঐক্য বহাল থাকবে। পাঁচ বছর বিএনপির সঙ্গে গলা জড়িয়ে জামাত আর ইসলামী ঐক্যজোট সব সুযোগ সুবিধা নিয়ে এখন বিএনপির দুঃসময়ে তাদের কেউই বিএনপির পাশে নেই। সাঈদীর কথামতো জামাতের মায়ের পেটের ভাই বিএনপি এখন বেকায়দায় পড়লেও জামাত ভুলেও খোঁজ নিচ্ছে না ভাইয়ের। বরং জামাতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পাঁচ বছরের দুর্নীতির দায়ভার জামাত বহন করবে না।

জামাত এখন বিএনপির সঙ্গ ত্যাগ করার সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে। চারদলীয় জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা পরিচয়ে যিনি পাঁচ বছর ঘুরে বেড়িয়েছেন সেই ফজলুল হক আমিনীও একদম চুপচাপ। তার ঘনিষ্ঠদের বলছেন, পাঁচ বছরে দেশে কোনো দুর্নীতি হলে সেটার জন্য দায়ী বিএনপি। ইসলামী ঐক্যজোট এর কোনো দায়ভার বহন করবে না। চারদলীয় জোটে এই ৩ দল ছাড়াও আরো একটি দল ছিল নাজিউর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি বা বিজেপি। চারদলীয় জোটে শোভা বর্ধনকারী নাজিউর রহমান মঞ্জু জোট সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে শুধুমাত্র মন্ত্রী হওয়া ছাড়া সব ধরনের সুযোগসুবিধা নিয়েছেন। কিন’ এই মঞ্জুরও এখন বিএনপির পাশে নেই। দুর্নীতি ও দুঃশাসনের যে অভিযোগ উঠছে চারদলীয় জোট সরকারের বিরুদ্ধে, এখন একমাত্র বিএনপি ছাড়া আর কেউ এর দায়ভার নেয়ার জন্যে পাশে নেই। সবাই এখন ঘাপটি মেরে লুকিয়ে আছে। বিশেষ করে জামাত ও ইসলামী ঐক্যজোট ধোয়া তুলসী পাতা সেজে জোট থেকে বের হওয়ার পরিকল্পনা করছে। চারদলীয় জোটে খোঁজখবর নিয়ে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব কোন্দলে জর্জরিত বিএনপির অবস্থা এখন কাহিল। দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য জিয়া পরিবার বিচারের কাঠগড়ায়। জিয়া পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী তারেক রহমান দুর্নীতির মামলায় জেল খাটছেন। খালেদা জিয়াকে করতে হচ্ছে নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকেও দুর্নীতির অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। খালেদা জিয়ার এক ভাই শামীম এস্কান্দারের নাম শীর্ষ দুর্নীতিবাজদের তালিকায় রয়েছে। আরেক ভাই মেজর (অব) সাঈদ এস্কান্দারকে খালেদা জিয়ার একক সিদ্ধান্তে দলের সহসভাপতি নিয়োগ দেওয়া নিয়ে দলের মধ্যে এখন বিদ্রোহ দেখা দিয়েছে। দলের শীর্ষ নেতা যারা একসময় দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার তোষামোদি করে ক্ষমতায় টিকে থাকতেন তারাও এখন জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন। সাইফুর রহমান, ড. ওসমান ফরুক, সাদেক হোসেন খোকা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে বক্তব্য দিয়েছেন।

দলের মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভুঁইয়া একদম চুপচাপ। বিএনপির হয়ে কোনো কথাই তিনি বলছেন না। অথচ ১১ জানুয়ারির আগ পর্যন্ত মান্নান ভুঁইয়া ছিলেন বিএনপি ও জিয়াপরিবারের সবচেয়ে সরব মুখপাত্র। কিন’ সময়ের বাস্তবতায় এখন সবকিছু যেন পাল্টে গেছে। ১১ জানুয়ারির পটপরিবর্তনের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে অন্য দলগুলোতে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন না এলেও পরিবর্তন এসেছে বিএনপি ও তার সঙ্গীয় জোটের মধ্যে। চারদলীয় জোটের চার দল এখন চতুর্মুখি অবস্থানে রয়েছে। বিএনপির মধ্যে চলছে ভাঙা-গড়ার খেলা। দুর্নীতির অভিযোগে দলের টপ টু বটম পর্যায়ের নেতারা আছেন দৌড়ের ওপর। ইসলামী ঐক্য জোটের ফজলুল হক আমিনী রয়েছেন সাড়াশব্দহীন অবস্থায়। বিজেপির নাজিউর রহমান মঞ্জুরও নিখোঁজ। কিন’ বিএনপি যে জামাতের ওপর পাঁচ বছর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল ছিল, যে জামাত ছিল বিএনপির ক্ষমতার প্রত্যক্ষ অংশীদার সেই জামাত এখন বিএনপির ধারেকাছেও নেই। জামাতের সঙ্গে মিত্রতা বন্ধনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছিলেন তারেক রহমান। বিএনপির মধ্যে যে অংশটি উদার ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শধারী হিসেবে গণ্য করা হয় গত পাঁচ বছরে তারেকপন্থী ও কট্টরপন্থীদের দাপটে তারা ছিলেন কোণঠাসা। জামাত নেতারাও তারেক বন্দনায় মত্ত থাকতেন। খালেদা জিয়ার দুয়ার দলের অনেক শীর্ষ নেতার পক্ষে অতিক্রম করা কষ্টসাধ্য হলেও জামাতের শীর্ষ নেতাদের জন্য ছিল অবারিত দ্বার। জিয়া পরিবারের সঙ্গে জামাতের এতো মধুর সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে খালেদা জিয়ার দুর্দিনে জামাত কোনো খবরই নেয়নি। তারেক গ্রেপ্তার হয়ে দু মাস ধরে জেলে আছেন, জামাতের নিজামী বা মুজাহিদ কেউই একটু খোঁজ নেননি বলে জানা গেছে। জামাতের পক্ষ থেকে কেউ খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখাও করেননি।
পরিবর্তিত অবস্থায় বিস্ময়কর পরিবর্তন এসেছে জামাতের মধ্যে। জামাতের দায়িত্বশীল সূত্রগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চারদলীয় জোট থেকে জামাত বের হয়ে যাবে এই সিদ্ধান্ত মোটমুটি চূড়ান্ত হয়ে আছে জামাতের নীতিনির্ধারণী মহলে। বিএনপির ওপর দুর্নীতির যে পাহাড়সম অভিযোগ উঠেছে এই বদনামের দায়ভার কোনোক্রমেই জামাত নেবে না এটাই এখন পর্যন্ত দলীয় সিদ্ধান্ত বলে জানা গেছে। জামাতের দায়িত্‌্বশীল কেউই এখন মুখ খুলতে চাচ্ছেন না। শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক জামাত নেতার সঙ্গে রাজনীতির হালহকিকত নিয়ে কথা বললে তারা স্পষ্ট করেই বলেন , বিএনপির সঙ্গে জামাত আর থাকবে না। ঘরোয়া রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলেই জামাত আনুষ্ঠানিকভাবে জোট থেকে বের হওয়ার ঘোষণা দেবে। একজন জামাত নেতা বলেন, বিএনপির কারণে জামাত বদনামের ভাগিদার হয়েছে। তিনি বলেন, বিএনপি ও অন্যান্য দলে সংস্কারের প্রয়োজন হলেও জামাতে সংস্কারের কোনো প্রয়োজন নেই এবং সুযোগও নেই। জামাতে গণতান্ত্রিক উপায়ে নেতৃত্ব নির্বাচন হয় বলে ঐ নেতা দাবি করেন।
এদিকে জামাতের এই মনোভাব সম্পর্কে বিএনপির নেতৃস্থানীয় একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বললে তারা মন্তব্য করেন, জামাত বিশ্বাসঘাতকতা করলে এতে আর অবাক হওয়ার কী আছে – বরং এটাই স্বাভাবিক ঘটনা । বিএনপির নেতারা বলেন, ঘরোয়া রাজনীতি চালু হলেই সবকিছু স্পষ্ট হবে।

Source:ভোরের কাগজ
Date:2007-05-14

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: