বিএনপিতে ক্যু-পাল্টা ক্যুর প্রস্তুতি

বিএনপিতে নেতৃত্বের দখল নিয়ে সংস্কারপন্থী ও খালেদাপন্থীরা ক্যু-পাল্টা ক্যু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। যে কোনো মুহূর্তে বহিষ্কার-পাল্টা বহিষ্কারের ঘটনা ঘটতে পারে। দু-পক্ষই অতি গোপনে তাদের কর্মকৌশল নির্ধারণ করছে। এ পরিস্থিতিতে বিএনপির ভাঙন অপরিহার্য বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন। এক গ্রুপ টেলিফোনে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে, অপর গ্রুপটি মহাসচিব মান্নান ভুঁইয়ার সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করছেন। এ গ্রুপটি ‘ওপর মহলের’ সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন বলে সূত্র জানিয়েছে। উল্লেখ্য, গত কদিন ধরে বিএনপির সংস্কারপন্থীরা (মাইনাস খালেদা) একের পর এক দলে পরিবারতন্ত্র ও চেয়ারপারসনের ক্ষমতা খর্ব করা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কথা বলে যাচ্ছেন। অপরদিকে সংস্কারপন্থীদের বিরুদ্ধে অন্য কেউ কথা না বললেও চেয়ারপারসনের একজন উপদেষ্টা প্রতিদিনই কথা বলছেন। সংস্কারপন্থীদের মধ্যে প্রথমেই মুখ খুলেন ঢাকা মহানগরী বিএনপির সভাপতি সাদেক হোসেন খোকা। তিনি দলীয় প্রধানের ক্ষমতা খর্ব করার ব্যাপারে তার মতামত তুলে ধরেন। এরপর সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. ওসমান ফারুক সংস্কারের পক্ষে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেন। সেই সঙ্গে তিনি আরো বলেন, বিএনপির জন্যই দেশে আজ এ অবস্থা। বিএনপির একগুঁয়েমির কারণেই ২২ জানুয়ারির নির্বাচন হতে পারেনি। তবে ২২ জানুয়ারি একতরফা নির্বাচন হলে দেশে গৃহযুদ্ধ লেগে যেতো। প্রবীন বিএনপি নেতা, সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান বলেন, মানুষ পরিবারতন্ত্র পছন্দ করে না। তাই পরিবারতন্ত্র থেকে বিএনপিকে মুক্ত করতেই হবে। এর জন্য দলের গঠনতন্ত্রও পরিবর্তন করতে হবে। গতকাল যুগ্ম মহাসচিব আশরাফ হোসেনও নতুন করে মুখ খুলেছেন।

পরবর্তী সময়ে আরো অনেক বিএনপি নেতা এ ব্যাপারে মুখ খুলবেন বলে জানা গেছে। বিএনপি সূত্র জানায়, বিগত জোট সরকারের আমলে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও তার জ্যেষ্ঠপুত্র তারেক রহমানের নির্দেশেই দল ও দেশের সকল কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো। তাদের সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো কথা বলার সাহস কারোই ছিল না। দলীয় ফোরামে তাদের সিদ্ধান্ত সবার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হতো। সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রেও সিনিয়র মন্ত্রীদের কর্মকাণ্ডে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতেন তারেক রহমান। তার নির্দেশে কাজ না করলে মন্ত্রীদের বিভিন্নভাবে নাজেহাল করতেন তিনি। দলের সিনিয়র নেতা ও সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের ওপর তরুণ নেতা ইলিয়াস আলীকে লেলিয়ে দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি তারেক রহমান। তাই দলের সিনিয়র নেতারা বিএনপি-জামাত জোট সরকার আমলের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়েই এখন সংস্কার তথা পরিবারতন্ত্র ও বিএনপিতে চেয়ারপারসনের ক্ষমতা খর্ব করার কথা প্রকাশ্যেই বলছেন।

এদিকে সংস্কারপন্থী শতাধিক কেন্দ্রীয় নেতার স্বাক্ষর বিএনপি মহাসচিব মান্নান ভুঁইয়ার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে বলে জানা গেছে। দলে সংস্কারপন্থীদের পাল্লা ক্রমেই ভারী হচ্ছে। তারা সবাই দল থেকে দুর্নীতিবাজদের অপসারণ, পরিবারতন্ত্রের অবসান ও চেয়ারপারসনের ক্ষমতা খর্ব ও শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন আনার পক্ষে। ঘরোয়া রাজনীতি শুরু হলেই তলবি সভা ডেকে তারা দলের গঠনতন্ত্রে সংশোধন এনে নেতৃত্বের আমূল পরিবর্তন করতে চাচ্ছেন। অপরদিকে খালেদা জিয়ার অনুসারী নেতারাও যারা এখন দলের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। বিএনপির যুগ্মমহাসচিব আশরাফ হোসেন গতকাল সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, গঠনতন্ত্রে পাওয়া ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন খালেদা জিয়া। চেয়ারপারসন হিসেবে তিনি মহাসচিবসহ দলের সকল পদের নিয়োগ দেন। একটি গণতান্ত্রিক দলে এ ধরনের নিয়ম থাকতে পারে না। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান গতকাল একটি টিভি চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, বিএনপিতে সংস্কার করতেই হবে। পরিবারের সদস্য হওয়াটা কোনো দলের নেতা হওয়ার যোগ্যতা হতে পারে না। এদিকে বিএনপির সহসভাপতি লে. জেনারেল (অব) মীর শওকত আলী একটি বেসরকারী টেলিভিশনকে বলেছেন, দলে সংস্কার করতেই হবে। সংস্কার ছাড়া বিএনপিকে বাঁচানো যাবে না। সংস্কার করে যুদ্ধাপরাধী, রাজাকার ও দুর্নীতিবাজদের দল থেকে বাদ না দিলে আমি আর বিএনপি করবো না। তবে তিনি একথা পরিস্কার করে উল্লেখ করেন যে, যেকোনো সংস্কার খালেদা জিয়ার নেতৃত্বেই করতে হবে। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) হান্নান শাহ বলেন, বিএনপি চলবে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে। যারা চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে কথা বলছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, আজ যারা দল ও দলের চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে কথা বলছেন তারাই ক্ষমতায় থাকতে সবচেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন।

বিএনপির সহসভাপতি এম কে আনোয়ার বলেন, দলীয় ফোরামে কথা না বলে বিচ্ছিন্নভাবে কথা বলে দুপক্ষই দলের ক্ষতি করছে। তারা সোজা জিনিসকে উল্টা-পাল্টা বক্তব্য দিয়ে জটিল করে ফেলছে। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও দলের মুখপাত্র নজরুল ইসলাম খান গতকাল সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, এখন কোনো কথা না বলাই ভালো। দলের ঐক্য নষ্ট হয় এমন কথা না বলাই ভালো।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলের এক সিনিয়র নেতা বলেন, সাইফুর রহমানের কথা ছাড়া জোট সরকারের আমলে গাছের পাতাও নড়তো না। তখন দলীয় ফোরামে তিনি পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বলেননি। অথচ আজ তিনি কতো কথাই না বলছেন।

Source:ভোরের কাগজ
Date:2007-05-14

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: